শাকিলের জানাজায় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বক্তব্য দিতে গেলে তার উদ্দেশে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন উপস্থিত লোকজনের একাংশ। ছবি : সংগৃহীতনাটোরের গুরুদাসপুরে পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলা কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার রাতে শাকিলের জানাজায় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বক্তব্য দিতে গেলে তার উদ্দেশে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন উপস্থিত লোকজনের একাংশ। জানাজার পর চাঁচকৈড় বাজারে একটি শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
এর আগে ওই দিন বিকালে শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেফতার সংসদ সদস্যের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। একই দিন মিন্টুকে যুবদল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিকে গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নানকে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)।
জানাজার পর শপিংমলে ভাঙচুর-লুটপাট : মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শাকিলের প্রথম জানাজা হয়। রাত ৮টার দিকে মরদেহ গুরুদাসপুরে পৌঁছায়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিলচলন শহিদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজার আগে বক্তব্য দিতে ওঠেন নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। ‘প্রিয় ভাইয়েরা আমার, আমার একটা কথা শুনতে হবে দাদারা’— বলার পরপরই উপস্থিত নেতাকর্মী ও মুসল্লিদের একাংশ ‘ভুয়া ভুয়া’ সেøাগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতির কারণে বক্তব্য শেষ করেন সংসদ সদস্য।
এ সময় আব্দুল আজিজ বলেন, তার ছেলে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলে তিনি ছেলের পাশে নয়, শাকিলের পাশেই থাকবেন। পরে জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বক্তব্য দেন। তিনি শাকিল হত্যার বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন সংসদ সদস্য। এ ঘোষণার পরও জানাজাস্থলে উত্তেজনা দেখা দেয়।
জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে চাঁচকৈড় বাজারে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ব্যবসায়ী রাসেল হোসাইনের মালিকানাধীন একটি শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের কারও কারও দাবি, মামলায় গ্রেফতার মিন্টুর সঙ্গে শপিংমলটির মালিকের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তবে এ সম্পর্কের সঙ্গে হামলার যোগসূত্র নিশ্চিত হয়নি।
শপিংমলের মালিকের দাবি, হামলায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার মালামাল লুট হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
যুবদল থেকে বহিষ্কার এমপিপুত্র মিন্টু, ওসি প্রত্যাহার
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় যুবদল মিন্টুকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সহযোদ্ধার প্রাণহানির মতো গুরুতর কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ বহিষ্কার করা হয়েছে।
যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বহিষ্কৃত ব্যক্তির কোনো অপকর্মের দায় দল নেবে না। সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে তার সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই দিন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদের সই করা আদেশে গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নানকে জনস্বার্থে রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে সেখানে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শাকিল হত্যা মামলার তদন্তভার থানা পুলিশের কাছ থেকে জেলা ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৪ অক্টোবর রাতে চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম। পথে মোটরসাইকেলে আসা হেলমেটধারী দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। প্রাণে বাঁচতে দৌড় দিলে তাকে ধাওয়া করে চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। গুরুতর আহত শাকিলকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
এর আগে ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল করিম মিস্ত্রি গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ছেলের মৃত্যুর পর তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। এদিকে তদন্তে নিহতের বাবার বক্তব্য আলাদাভাবে রেকর্ড করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে পুলিশের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে