ছিমছাম পাকা সড়কের পশ্চিমে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত কয়েক হাজার মানুষ বসতির গ্রাম, আর সড়কের পূর্বদিক ৩০ ফিট চওড়া খাল। খালের ওপারে ৪ দশক ধরে বসবাস করেন ১০টির অধিক পরিবার। শুকনো মৌসুমে মালামাল পরিবহনে বড় সমস্যার পাশাপাশি বর্ষায় জলধারার সঙ্গে নেমে আসে অসহনীয় দুর্ভোগ। পাড়াটির চারপাশে অথৈ পানিতে জমে দ্বীপাকৃতি সৃষ্টি হয়।
খালে ১০ ফুটের অধিক পানি থাকে প্রায় ৬ মাস। বৃদ্ধ, শিশু, প্রতিবন্ধী থেকে শিক্ষার্থী সবাই ভুক্তভোগী। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনা ঘটে গবাদিপশু এবং মালামাল স্থানান্তরে। এমন চিত্র দেখা গেছে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের বিয়ারা চরপাড়া গ্রামে। যেন আধুনিক সভ্যতা থেকে ৩০ ফুট দূরে ১০টি পরিবার।
দীর্ঘদিন ধরে একটি সেতুর জন্য অপেক্ষা করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। লিখিত আবেদন করেও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না তারা। বাঁশের তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ সরু সাঁকো, কিংবা পানি সাঁতরিয়ে যাপিত হচ্ছে জীবন। যে জীবনে সীমাহীন দুর্ভোগ জন্মগত অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালে স্থাপিত কাজিপুর পৌরসভা ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত, ৯টি ওয়ার্ডে মোট জনসংখ্যা ২২ হাজার ৩১০ জন। এর মধ্যে ৮নং ওয়ার্ডে ১ হাজার ৩০৩ জনের বসবাস। বিয়ারা গ্রামের কিছু অংশ এবং চরপাড়া নিয়ে গঠিত ওয়ার্ডটি পৌর এলাকার পূর্ব সীমান্তে। রয়েছে ২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৪টি মসজিদ।
উপস্থিত ভুক্তভোগী আব্দুল কাদের (৪৫) বলেন, তার বাবা মৃত কুড়ান মণ্ডল খালের ওপারে বাড়ি করেন প্রায় ৪০ বছর পূর্বে। পরবর্তীতে যমুনা নদীভাঙনে শিকার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ এসে বসতি স্থাপন করে, শুরু থেকেই সবাই পৌরসভার ভোটার। ছোট পাড়াটিতে ১০টির অধিক পরিবার বসবাস করে। এদের মধ্যে ১৫ জন শিক্ষার্থী, যাদের অধিকাংশই শিশু।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ, নারীসহ বাসিন্দারা আজীবন প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বর্ষার শুরু থেকে প্রায় ৬ মাস খালে ১০ ফুটের বেশি পানি থাকে, এতে করে চারদিকে পানিবেষ্টিত দ্বীপের মতো হয়ে পড়ে। প্রতি বছর নিজেদের উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়, পারাপারে হরহামেশাই দুর্ঘটনা ঘটে, ছোট বড় অনেকেই পানিতে পরে যায়।
এ সময় উপস্থিত প্রায় ১৫/২০ জন বিভিন্ন বয়সি মানুষ কাদেরের কথায় সম্মতি জানান। বাঁশের সাঁকো পারাপারে একাধিক শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োবৃদ্ধ দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছেন বলে জানান তারা।
কাজিপুর পৌরসভায় দীর্ঘদিন কর্তব্যরত প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম (লিটন) এ জনদুর্ভোগ বিষয়ে বলেন, টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অনেক ব্রিজ-কালভার্টের প্রস্তাবনা দেওয়া আছে, ডিসেম্বর নাগাদ পাস হতে পারে।
কাজিপুর পৌরসভার নব্য যোগদাকারী প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনাজ পারভীনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী ফজলার রহমান (৬৬) বলেন, আমার জীবন তো চলেই গেল, নাতিপুতিরা খুব দুর্ভোগে আছে, ওরা স্কুলে যায়। গরু-ছাগল কথা বলতে পারে না, পারলে বোঝা যেত দুর্ভোগ কতটা নির্মম।
৪৮ বছর বয়স্ক পিয়ারা খাতুন বলেন, চার পাশে পানি থাকে, আমরা দ্বীপে নির্বাসিতদের মতো বসবাস করি, আধুনিক সভ্যতা থেকে মাত্র ৩০ ফুট দূরে, পৌর সুযোগ-সুবিধা দূরে থাক, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এখানে পৌঁছায় না, স্বাভাবিক জীবন ব্যহত। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছরে কাজিপুর পৌরসভার মেয়র বরাবরে একটি ব্রিজ চেয়ে একাধিকবার লিখিত আবেদন করে আসছি, সর্বশেষ গত ২৬ জুলাই পৌর প্রশাসক বরাবরে লিখিত আবেদন করেছি, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হলেও প্রায় ৪০ বছর ধরে অপেক্ষায় আছি, আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এত উন্নয়নের ভিড়ে মাত্র ৩০/৪০ ফুটের একটি ব্রিজ হতেও পারে।
জনদুর্ভোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিউটি খাতুন (৪০) বলেন, বাড়িঘর উন্নয়ন করা যাচ্ছে না, বিয়ে উপযুক্ত ছেলেমেয়ে ঘরে আছে, বাড়িতে লোকজন আনতে পারি না, এলেও রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখে সম্বন্ধ আগায় না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে