হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ার পর ইরান এখন ইরাক ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করছে। একই সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতাও বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকাতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
আগে ইরানের আঞ্চলিক শক্তির বড় ভরসা ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাসের মতো গোষ্ঠী। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধগুলোতে এসব গোষ্ঠী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এখন ইরানের জন্য ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের ইরানপন্থি মিলিশিয়াগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইরাকি মিলিশিয়া ও হুথিদের সহযোগিতা বাড়ছে
ইরাক ও ইয়েমেনের এই দুই পক্ষ আগে থেকেই ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের মধ্যে সরাসরি সহযোগিতা বাড়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
জুলাইয়ে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় বড় ধরনের হামলার ঘটনায় এই সহযোগিতার বিষয়টি সামনে আসে।
বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানপন্থি ইরাকি মিলিশিয়াদের পরিকল্পনা ও হামলা পরিচালনায় ইয়েমেনের হুথি সদস্যরা সহযোগিতা করেছিলেন।
সৌদি ও ইরাকি কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, হুথিদের প্রতিনিধিরা ইরাকি মিলিশিয়াদের পরিচালিত একটি অপারেশন কক্ষে কাজ করেছিলেন।
এর অর্থ হলো, তারা শুধু আলাদাভাবে নিজেদের অভিযান চালাচ্ছে না; বরং কিছু ক্ষেত্রে একসঙ্গে পরিকল্পনাও করছে।
তবে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফের দুই কর্মকর্তা এই হামলায় নিজেদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তারা হুথিরাও তাদের অধীনে কাজ করেছে, এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পাল্টা হামলা
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র পরে ইরাকের কয়েকটি ইরানপন্থি মিলিশিয়ার ওপর যৌথ বিমান হামলা চালায়।
এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব হামলায় অন্তত ২০ জন ইরাকি যোদ্ধা, ৬ জন ইরানি সামরিক উপদেষ্টা এবং অন্তত একজন হুথি কর্মকর্তা নিহত হন।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সহযোগিতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কেন হুথিরা ইরানের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইয়েমেনের হুথিরা এখন আর শুধু ইয়েমেনের ভেতরের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়।
তাদের হাতে রয়েছে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং পানির নিচে চলতে সক্ষম চালকবিহীন ব্যবস্থা।
এসব অস্ত্র দিয়ে তারা ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলোতেও তাদের এই সক্ষমতা দেখা গেছে।
সৌদি আরবে হুথি হামলা
মঙ্গলবার হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে বড় ধরনের হামলা চালায়।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় তেল স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং ৭৩ জন আহত হন।
ফেব্রুয়ারিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের অন্যতম বড় হামলা।
জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে হুথিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকারের বিরুদ্ধেও একাধিক হামলা চালিয়েছে।
ফলে হুথিরা এখন দুটি সংঘাতের মাঝখানে অবস্থান করছে, একদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের যুদ্ধ।
হুথিরা ইরানের নির্দেশেই হামলা করে না
তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, ইরান হুথিদের সমর্থন করলেও হুথিরা ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো সংগঠন নয়। হুথিদের নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। এর পরের বছর সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে।
দীর্ঘ এই সংঘাতে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হন। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের লড়াই অনেকটা থেমে গিয়েছিল।
কিন্তু এখন সেই যুদ্ধবিরতিও আবার দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী কয়েকটি এলাকায় হুথিদের সঙ্গে লড়াই করছে। অন্যদিকে হুথিরাও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর মোখা-সহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালাচ্ছে।
যুদ্ধ আবার বড় আকারে শুরু হলে পূর্ব ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে হুথিরা।
অর্থাৎ ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত কমে গেলেও হুথিদের নিজেদের যুদ্ধ আলাদাভাবে আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।
ইরাকেও বড় চ্যালেঞ্জ
ইরাকের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক অংশ। তবে এই সংগঠনের ভেতরে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ইরানপন্থী গোষ্ঠী রয়েছে।
ইরাক সরকার সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বিভিন্ন মিলিশিয়াকে অস্ত্র ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী সেই নির্দেশ মানতে চাইছে না।
ফলে ইরাক সরকার কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে।
তারা একদিকে নিজেদের দেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চাইছে, অন্যদিকে ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইরাকি মিলিশিয়াদের সঙ্গে হুথিদের যোগাযোগের খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পুরোনো ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ কি বদলে যাচ্ছে?
ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একটি মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এটিকে অনেক সময় ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধের জোট বলা হয়।
হিজবুল্লাহ ও হামাস এখনো পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়নি। ইরানের আরও কয়েকটি মিত্র গোষ্ঠীও সক্রিয় রয়েছে।
তবে এই নেটওয়ার্কের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে।
আগে ইসরায়েলের চারপাশে থাকা গোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে হিজবুল্লাহ ও হামাস, ইরানের কৌশলের বড় অংশ ছিল। এখন ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকের মিলিশিয়াগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হুথিদের রয়েছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। পাশাপাশি তারা সমুদ্রপথে জাহাজে হামলার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে। অন্যদিকে ইরাকি মিলিশিয়ারা এমন একটি দেশে সক্রিয়, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সেনা ও মার্কিন স্বার্থ রয়েছে।
দুই পক্ষের সহযোগিতা তাই ইরানকে নিজের দেশের বাইরে আরও বেশি জায়গায় চাপ তৈরি করার সুযোগ দিচ্ছে।
এতে ঝুঁকিও বাড়ছে
তবে এই সহযোগিতার ফলে পরিস্থিতি আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে যত বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী যুক্ত হবে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা তত কঠিন হবে।
ইরাকের কোনো মিলিশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদি আরব পাল্টা হামলা চালাতে পারে। হুথিরা সৌদি আরবে হামলা করলে ইয়েমেনের যুদ্ধ আবার বড় আকার নিতে পারে।
আবার তেলবাহী কোনো জাহাজে হামলা হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ একটি ছোট হামলাও ধীরে ধীরে বড় আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
কেন উপসাগরীয় তেলপথ এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই পুরো সংঘাতের অন্যতম বড় বিষয় হলো তেল ও জ্বালানি পরিবহনের সমুদ্রপথ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালি।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
সৌদি আরবের লোহিত সাগরের পথ এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালিতে সমস্যা তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব তাদের তেলের একটি বড় অংশ দেশের পশ্চিম উপকূলের দিকে পাঠাতে শুরু করেছে। সেখান থেকে তেল লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল ও মিসরের সুমেড পাইপলাইন ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে যাওয়ার সুযোগ পায়।
তথ্য অনুযায়ী, এই পথে সৌদি তেল পরিবহনের পরিমাণ জুনে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে আগস্টে ১৯ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে।
কিন্তু এখন হুথিদের হামলা এই বিকল্প পথকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
তেলবাহী জাহাজও হুথিদের লক্ষ্যবস্তু
হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে।
তারা তেলবাহী জাহাজ ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলাও চালিয়েছে।
গত মাসে হুথিরা উত্তর লোহিত সাগরে একটি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। জাহাজটি ইয়ানবু থেকে সুয়েজ খালের দিকে যাচ্ছিল বলে জানা গেছে।
জাহাজটি হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরে ছিল।
এতে বোঝা যায়, ইয়েমেনের বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা হুথিদের রয়েছে।
হরমুজেও জাহাজ চলাচল কমেছে
হরমুজ প্রণালিতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাত্র ৬টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক সমস্যা নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্বের তেল ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর।
ইরানের পুরোনো মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হামাস ও হিজবুল্লাহ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার পর ইরাক ও ইয়েমেনের গোষ্ঠীগুলো ইরানের কৌশলে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হুথিরা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা দিয়ে ইরানকে নতুন ধরনের চাপ তৈরির সুযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরাকি মিলিশিয়াগুলো মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এলাকায় সক্রিয়।
তবে এসব গোষ্ঠী ইরানের ঘনিষ্ঠ হলেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রয়েছে। তাই ইরানের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, ইয়েমেনের যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় তেল পরিবহন, এই তিনটি সংকট এখন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সংঘাত খুব সহজেই বিশ্বের জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র : গালফ নিউজ
সময়ের আলো/ইউএমএইচ