২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। দিনের শুরুটা ছিল অন্য যেকোনো দিনের মতোই। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়াঙ্গনে তখন আলোচনায় ছিল মাইকেল জর্ডানের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, ব্যারি বন্ডসের হোম রান রেকর্ডের দৌড় কিংবা আমেরিকান ফুটবলের নানা হিসাব-নিকাশ। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সবকিছু বদলে যায়। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে সন্ত্রাসী হামলা শুধু হাজারো মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি, স্তব্ধ করে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনকেও।
সেই দিন প্রমাণ হয়ে যায়, খেলাধুলা কখনোই রাজনীতি, যুদ্ধ কিংবা বৈশ্বিক সংকট থেকে পুরোপুরি আলাদা কোনো জগৎ নয়। ৯/১১-এর পর মাঠে খেলা বন্ধ হয়েছে, বদলেছে দর্শকদের অভিজ্ঞতা, এসেছে অভূতপূর্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা। একই সঙ্গে শোক, সংহতি ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবেও ক্রীড়াঙ্গন নতুন ভূমিকা নিয়েছে।
থেমে গিয়েছিল খেলার চাকা
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক ক্রীড়া আয়োজন স্থগিত করা হয়। মেজর লিগ বেসবল (MLB) প্রায় এক সপ্তাহের জন্য সব ম্যাচ স্থগিত করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন ক্রীড়া ইতিহাসে প্রথম। ন্যাশনাল ফুটবল লিগ (NFL) তাদের নির্ধারিত সব ম্যাচ বাতিল করে, যার ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুপার বোল অনুষ্ঠিত হয় ফেব্রুয়ারিতে। আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা (UEFA) Champions League ও UEFA Cup-এর ম্যাচ স্থগিত ঘোষণা করে। গলফের মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট 'রাইডার কাপ' পিছিয়ে দেওয়া হয় পুরো এক বছর।
অর্থাৎ ৯/১১-এর অভিঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়াঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছিল আটলান্টিক পেরিয়েও।
খেলা যখন আবার মাঠে ফিরতে শুরু করল, তখন আগের পৃথিবী আর ছিল না। দর্শক, খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও আয়োজকদের কাছে নিরাপত্তা হয়ে উঠল অন্যতম প্রধান বিষয়।
স্টেডিয়াম হয়ে গেল নিরাপত্তা দুর্গ
৯/১১-এর আগে অনেক স্টেডিয়ামে প্রবেশের প্রক্রিয়া ছিল তুলনামূলক সহজ। টিকিট দেখিয়ে দর্শকরা মাঠে ঢুকে যেতেন। কিন্তু হামলার পর সেই চিত্র আমূল বদলে যায়।
মেটাল ডিটেক্টর, ব্যাগ তল্লাশি, প্রবেশপথে বাড়তি নজরদারি এবং স্টেডিয়ামের আকাশসীমায় বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে বড় ক্রীড়া আয়োজনের নিয়মিত অংশ হয়ে ওঠে। ক্রীড়াঙ্গনে নিরাপত্তা আর শুধু মাঠের ভেতরের শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় থাকল না, বরং তা পরিণত হলো বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।
২০০২ সালের সল্টলেক সিটি শীতকালীন অলিম্পিক ছিল ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বের নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার বড় উদাহরণ। এরপর অলিম্পিক, বিশ্বকাপসহ বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনগুলোতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত ও কঠোর হতে থাকে।
খেলাধুলায় যুদ্ধের ছায়া
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু হলে এর প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও। আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পতন ও পরবর্তী সংঘাত দেশটির ক্রীড়া অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া যোগাযোগকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সংকটে ফেলে।
একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক সফর, ভিসা, যাতায়াত ও দলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয় আয়োজকদের। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন স্থগিত বা বাতিল হওয়ার ঘটনাও দেখা যায়।
ফলে খেলাধুলার আন্তর্জাতিক চরিত্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শোক থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মঞ্চ
তবে ৯/১১-এর পর ক্রীড়াঙ্গনের গল্প শুধু ভয় আর নিরাপত্তার নয়। স্টেডিয়ামগুলো হয়ে ওঠে মানুষের শোক প্রকাশ, সংহতি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতীক।
২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে হামলার পর প্রথম বড় ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটিতে মুখোমুখি হয়েছিল নিউইয়র্ক মেটস ও আটলান্টা ব্রেভস। মাঠে উপস্থিত ছিলেন উদ্ধারকর্মী ও জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা। খেলোয়াড়দের পোশাক ও টুপিতেও ছিল নিউইয়র্ক পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতিফলন।
সেই ম্যাচে মাইক পিয়াজার হোম রান মুহূর্তটি বিশেষ আবেগের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিপর্যয়ের কয়েক দিন পর মাঠে দাঁড়িয়ে তার সেই উদ্যাপন নিউইয়র্কবাসীর কাছে ক্রীড়ার বাইরেও অন্য এক অর্থ বহন করেছিল।
এর কিছুদিন পর বেসবল ওয়ার্ল্ড সিরিজে ইয়ানকি স্টেডিয়ামে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রথম বল ছোড়ার ঘটনাও একই বার্তা বহন করে। ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্বাভাবিক জীবন থেমে থাকবে না, ক্রীড়াঙ্গন হয়ে উঠেছিল সেই বার্তার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।
৯/১১-এর দীর্ঘ ছায়া
দুই দশকেরও বেশি সময় পরও ৯/১১-এর প্রভাব ক্রীড়াঙ্গনে দৃশ্যমান। বড় টুর্নামেন্টে প্রবেশের আগে দীর্ঘ নিরাপত্তা তল্লাশি, দর্শকদের ব্যাগ ও পরিচয় যাচাই, আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এখন ক্রীড়া আয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরবর্তীতে ড্রোনের মতো নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তার ঘটেছে।
৯/১১ তাই শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার তারিখ নয়, ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসেও একটি বিভাজনরেখা। তার আগে খেলা ছিল মূলত প্রতিযোগিতা, বিনোদন ও দর্শকের আবেগের জায়গা। পরে সেই মাঠই হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা, জাতীয় সংহতি, সামাজিক বার্তা এবং কখনো কখনো ভূরাজনীতিরও মঞ্চ।
৯/১১ খেলার মাঠকে থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু খেলা যখন ফিরেছিল, তখন সেই মাঠ আর আগের মতো ছিল না।
সময়ের আলো/টিকে