চাকরির আশায় রাশিয়া, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ গেল মামুনের

নিজস্ব সংবাদ দাতা

সারাদেশ

ঘরের একমাত্র ছেলেকে ঘিরে কত স্বপ্নই না ছিল রোকেয়া খাতুনের। অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি আসবে, ঋণের বোঝা কমবে, ভাঙা ঘরের

2026-09-11T12:59:54+00:00
2026-09-11T12:59:54+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
চাকরির আশায় রাশিয়া, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ গেল মামুনের
নিজস্ব সংবাদ দাতা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম 
নিহত মামুন। ছবি : সংগৃহীত
ঘরের একমাত্র ছেলেকে ঘিরে কত স্বপ্নই না ছিল রোকেয়া খাতুনের। অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি আসবে, ঋণের বোঝা কমবে, ভাঙা ঘরের জায়গায় উঠবে পাকা ঘর— সবই ছিল সেই স্বপ্নের অংশ। প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ করে ছেলে আল মামুনকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তিনি। কথা ছিল, ইলেকট্রিকের কাজ করবেন, দুই-তিন বছর পর দেশে ফিরে সংসারের হাল ধরবেন।

কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। পরিবারের দাবি, চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়ার পর মামুনসহ একদল বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তিতে সই করানো হয়। পরে তাঁদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। সেখানে ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হয়েছেন বলে পরিবারের কাছে খবর এসেছে।

এখন রোকেয়া খাতুনের একটাই আকুতি— যেভাবেই হোক ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার পুতের লাশটা দেশে আনার ব্যবস্থা সরকার করুক। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশটা দেখতে চাই। দালাল আমার সব শেষ কইরা দিলো।’

ইলেকট্রিশিয়ান থেকে যুদ্ধের ময়দানে

আল মামুন (২৪) ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুনের একমাত্র ছেলে। দেশে থাকাকালে ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করতেন তিনি।

স্ত্রী মহিমা আক্তার, চার বছর ছয় মাস বয়সী ছেলে আরিয়ান মাহমুদ মাহিন এবং পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে আরিশফাকে রেখে গত ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন মামুন।

পরিবারকে বলা হয়েছিল, রাশিয়ায় গিয়ে তিনি ইলেকট্রিকের কাজ করবেন। ভালো আয় করে দুই-তিন বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করবেন। এরপর বাড়িতে একটি পাকা ঘর তৈরি করবেন। সেই আশাতেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরই বদলে যায় পরিস্থিতি। ব্যাংক কার্ড, মুঠোফোনের সিম ও অন্যান্য কাগজপত্র দেওয়ার কথা বলে মামুনসহ বাংলাদেশিদের রুশ ভাষায় লেখা একটি চুক্তিতে সই করানো হয়। তারা রুশ ভাষা না বোঝায় চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, সেটি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি।

এরপর তাদের একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে।

মামুনের সঙ্গে একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেনও একই দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, ৩০ বাংলাদেশির একটি দলকে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে চাকরি দেওয়ার কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল।

রাজন বলেন, ৮ মে তারা রাশিয়ায় পৌঁছান। কয়েক দিন পর ১২ মে ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ড ও ‘আকামা’ দেওয়ার কথা বলে তাদের একটি চুক্তিতে সই করানো হয়। চুক্তিটি রুশ ভাষায় লেখা থাকায় তারা এর বিষয়বস্তু বুঝতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, সেটি ছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি।

রাজনের দাবি, এরপর তাদের সেনাক্যাম্পে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারও ১০ দিন, কারও ১৫ দিন এবং সর্বোচ্চ ২১ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পর স্ত্রী মহিমা আক্তারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারতেন না মামুন। তবে ভয়েস বার্তা ও ছবি পাঠাতেন। সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট তিনি স্ত্রীকে একটি ভয়েস বার্তা পাঠান। এরপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।

মহিমা বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার সময় স্বামী ভয় ও শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে, কখন কী ঘটে বলা যায় না।’ সন্তানদের দেখে রাখার কথাও বলেছিলেন তিনি।

সেই কথাগুলোই এখন বারবার মনে পড়ছে মহিমার।

মামুনের মৃত্যুর খবর পরিবার পায় গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর)। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে রাজন হোসেন তাদের জানিয়েছেন।

রাজন নিজেও সেখানে আহত হন। পরে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রাশিয়া থেকে পালিয়ে ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন। তার ভাষ্য, ১৮ আগস্ট তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। পরে রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতায় দেশে ফেরেন।

রাজন বলেন, তাদের দলের জন্য একজন রুশভাষী কমান্ডার ছিলেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণে বাংলাদেশিদের বিষয়ে কিছু তথ্য জানতে পারতেন। ওই কমান্ডারের কাছ থেকেই মামুনের মৃত্যুর খবর পান তিনি।

রাজনের দাবি, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হন। এরপর তিনি তার পরিবারকে খবর দেন।

একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ১৭ জন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন রাজন। আরও কয়েকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

দেড় মাসের মেয়েকে রেখে গিয়েছিলেন

মামুনের ছোট মেয়ে আরিশফার বয়স এখন পাঁচ মাস। মেয়েটির বয়স যখন মাত্র দেড় মাস, তখনই রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি।

মহিমা আক্তারের অভিযোগ, ইলেকট্রিকের কাজের কথা বলেই তার স্বামীকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। তিনি যুদ্ধ করতে যাননি। দালালেরা প্রতারণা করে মামুনসহ একই দলের ৩০ বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়ে গেছে বলে তার দাবি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মহিমা বলেন, ‘আমার দুইটা সন্তান। ওদের দেখার মতো আর কেউ নাই। স্বামীই একমাত্র ছিল। এখন আমি কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। চোখভরা স্বপ্ন আর আশা নিয়ে ওকে রাশিয়ায় পাঠাইছিলাম। এখন শুধু স্বামীর লাশটা দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে চাই।’

ঋণ করে, গরু বিক্রি করে বিদেশযাত্রা

মামুনকে রাশিয়ায় পাঠাতে পরিবারের খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। এই অর্থ জোগাড় করতে ঋণ নিতে হয়েছে, ধানের ওপর দাদন করতে হয়েছে। এমনকি গরুও বিক্রি করেছে পরিবার।

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। ধানের ওপর প্রায় চার লাখ টাকা দাদন নেওয়া হয়। বাকি টাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার এবং গরু বিক্রি করে জোগাড় করা হয়।

রোকেয়া খাতুনের কাছে এখন সেই ঋণের বোঝাও যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। ছেলে নেই, কিন্তু ঋণের টাকা রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে বিদেশ গেছিল নিজের ভাগ্য বদলানোর জন্য, আমাদের ভালো রাখার জন্য। সাড়ে ৮ লাখ টাকা ঋণ করে দিছি। এখন ছেলেই নাই। নাতি-নাতনিদের কীভাবে বড় করব, জানি না।’


মামুন ঠিক কখন, কোথায় মারা গেছেন কিংবা তার মরদেহ বর্তমানে কোথায় রয়েছে— এসবের কোনো তথ্য এখনো পরিবারের কাছে নেই।

ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই বাড়িতে শোকের পরিবেশ। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পরিবারের পক্ষ থেকে মিলাদের আয়োজন করা হয়। স্বজনেরা নিজেদের উদ্যোগে এ আয়োজন করেন। বাড়ির এক পাশে রান্নাবান্না চলছিল, অন্য পাশে বসে কাঁদছিলেন রোকেয়া খাতুন ও মহিমা আক্তার।

মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেও সমাধান মেলেনি

মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তার খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার। তিনি জানান, প্রায় দুই বছর আগে মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন ভিসা না হওয়ার পর ‘জাবাল-এ নূর’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে তার ভিসা হয়। এরপর গত ৭ মে রাশিয়া যান মামুন।

কোবিলা আক্তারের দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার পর মামুনদের রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে সই করানোর বিষয়টি জানতে পেরে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন। সেখানে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না।

তবে পরিবারের অভিযোগ, এরপরও সমস্যার সমাধান হয়নি। মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে তরা একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন। এমনকি মামলা করার জন্য থানায়ও যোগাযোগ করেন। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া তেমন কোনো সমাধান পাননি বলে দাবি করেন কোবিলা আক্তার।

তাঁর অভিযোগ, ‘জাবাল-এ নূর’ এজেন্সির মাধ্যমেই প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

কোবিলা আক্তারের দাবি, ৩০ বাংলাদেশিকে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল।

এখন শুধু ছেলের মরদেহ ফেরার অপেক্ষা

মামুনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে রোকেয়া খাতুনের মুখে ঘুরছে একই কথা— ছেলে কেন যুদ্ধে গেলেন, কীভাবে গেলেন, কোথায় মারা গেলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না।

তিনি শুধু জানেন, ভাগ্য বদলাতে বিদেশে যাওয়া একমাত্র ছেলে আর কোনোদিন ঘরের দরজায় ফিরবেন না। তাই এখন তার একমাত্র চাওয়া, ছেলের মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি যাদের প্রতারণার কারণে ছেলেকে যুদ্ধের ময়দানে যেতে হয়েছে বলে পরিবার অভিযোগ করছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলেকে যে দালাল বেইচা দিছে, এই দালালের বিচার চাই। সরকারের কাছে এই আবেদন।’

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি তার পরিবার মৌখিকভাবে জানিয়েছে। পরিবারকে লিখিত আবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, লিখিত আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   চাকরি  আশা  রাশিয়া  যুদ্ধক্ষেত্র  প্রাণ 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: