৩৩ বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে যে নতুন প্রত্যাশার দরজা খুলেছিল, এক বছর পর তার অনেকটাই আটকে আছে বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। নির্বাচনের সময় ইশতাহারে ছিল ৪৬টি প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যে ১৩টি বাস্তবায়নের দাবি করছে জাকসু। আরও ৩০টি রয়েছে বিভিন্ন ধাপে। দুটি প্রতিশ্রুতির উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। আর একটি স্বাস্থ্যবিমা নির্বাচনের আগেই চালু ছিল।
ফলে এক বছর পূর্তিতে জাকসুর সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু ‘কতটি প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে’ তা নয়; বরং বাকি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে পৌঁছাবে কবে?
জাকসুর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩০টি প্রতিশ্রুতির বড় অংশ এখনো কমিটি গঠন, সুপারিশ তৈরি কিংবা প্রশাসনের অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ কাগজে এগুলো ‘চলমান’ হলেও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়।
যে জায়গাগুলোতে পরিবর্তন এসেছে
এক বছরে জাকসুর কিছু উদ্যোগ অবশ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে ওষুধের পরিধিও বেড়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল সুবিধা চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের সংখ্যা, ট্রিপ ও রুট বাড়ানোর পাশাপাশি লাইভ ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন চালু করা হয়েছে। তবে ওয়াই-ফাইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। আন্তহল ও আন্তবিভাগ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনও জাকসুর দৃশ্যমান কার্যক্রমের তালিকায় রয়েছে। তবে এসব সাফল্যের পাশাপাশি বড় একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ইশতেহারে যে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, তার কতটা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত জীবনযাপনে পৌঁছেছে?
জাকসুর ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেশনজট নিরসন ও শিক্ষা ক্যালেন্ডার বাস্তবায়ন, শিক্ষক মূল্যায়ন, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, গবেষণা সফটওয়্যার সরবরাহ এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর অধিকাংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরির অংশ হিসেবে ভাষা প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন কর্মশালা হলেও সেগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অ্যাকাডেমিক সহায়তার বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ কম। অন্যদিকে শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল গঠন ও সম্পূরক বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি।
এখানেই জাকসুর ইশতেহারের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার বড় ফারাকটি চোখে পড়ে। কারণ, নির্বাচনের সময় যেসব প্রতিশ্রুতি শিক্ষার্থীদের সরাসরি শিক্ষা, অর্থনৈতিক সহায়তা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেগুলোর বাস্তবায়নই এখনো সবচেয়ে ধীর।
পরিবেশের প্রতিশ্রুতিও অপেক্ষায়
সবুজে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও বড় পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। প্রতিবেশগত মহাপরিকল্পনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং জোরদারের প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ডাইনিংয়ে ভর্তুকি, খেলার মাঠ ও জিমনেসিয়ামের উন্নয়নও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সমান সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়ে গেছে। ডে-কেয়ার, নারী কমন রুম ও লিফট চালু হয়নি। যৌন নিপীড়ন অভিযোগ সেলও আগের কাঠামোতেই রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবায় ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স চালু হওয়া এবং ওষুধের আইটেম বাড়ানোকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আধুনিক ডিসপেনসারি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে এখনো মূলত কর্মশালা পর্যায়ের কার্যক্রমই দেখা গেছে। ছাত্রী হলের নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে গেস্টরুম সংস্কৃতি বন্ধের ক্ষেত্রে জাকসুর আলাদা উদ্যোগের প্রয়োজন হয়নি; জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে এটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম অবশ্য মনে করেন, ইশতেহারের অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়িত হয়েছে। তার ভাষ্য, বাকি কাজগুলোও প্রক্রিয়াধীন এবং প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কিছু উদ্যোগে সময় লাগছে।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিতে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে একটি প্রতিশ্রুতি কমিটি গঠন বা সুপারিশ তৈরির পর্যায়ে থাকলে সেটিকে কি বাস্তবায়নের অগ্রগতি হিসেবে ধরা যায়?
এই প্রশ্নটিই আগামী দিনের জাকসুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ, শিক্ষার্থীরা শুধু উদ্যোগের ঘোষণা নয়, তার দৃশ্যমান ফল চান।
জাকসুর জিএস ও ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ইশতেহারে দেওয়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে। যেগুলো বাকি রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কিছু কাজ হতে বিলম্ব হয়েছে।
জাকসুর প্রথম বছর শুধু কার্যক্রম দিয়ে আলোচিত হয়নি; কয়েকজন নেতার কর্মকাণ্ড নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে সক্রিয়তা দেখাতে গিয়ে জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক হোসনে মোবারক এবং কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতি একাধিক ঘটনায় আলোচনায় আসেন। খাবারে মাছি পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দোকানের কর্মচারীর গায়ে হালিমের বাটি ছুড়ে মারার অভিযোগ, পরে দোকানদারদের সঙ্গে উত্তেজনা— এসব ঘটনায় জাকসুর প্রতিনিধিদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
জাকসুর আয়োজিত একটি সেমিনার ভিপি আব্দুর রশিদের আপত্তির পর বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামনে আনে। অটোরিকশা চলাচল নিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে ভিপির নাম আলোচনায় আসা, ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও ভিপির হলে অবস্থান বছরজুড়ে এসব ঘটনাও জাকসুর ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে।
জাকসু নির্বাচনের সময় নির্দলীয় পরিচয় এবং লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়। কিন্তু নির্বাচনের পর ভিপি আব্দুর রশীদ বিএনপিতে যোগ দেন। অন্যদিকে জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা যায়। এতে নির্বাচনের সময় দেওয়া ‘নিরপেক্ষ’ থাকার প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জিএস মাজহারুল ইসলাম অবশ্য বলেছেন, ক্যাম্পাসের ভেতরে জামায়াতের কোনো কর্মসূচিতে তিনি অংশ নেননি এবং ক্যাম্পাসের বাইরে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যক্তিগত ও আদর্শিক অবস্থান থেকে। ভিপি আব্দুর রশিদের বক্তব্যও একইভাবে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পক্ষে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশের প্রশ্ন— নির্বাচনের সময়কার প্রতিশ্রুতি আর নির্বাচনের প্রকার রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে?
আস্থার জায়গাটিই এখন বড় পরীক্ষা
৩৩ বছর পর জাকসু ফিরে আসায় গত বছর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, এক বছর পর সেই আবেগ অনেকটাই কমেছে। নতুন নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগের মতো দৃশ্যমান আগ্রহও নেই। এটি শুধু একটি সংগঠনের জনপ্রিয়তা কমার বিষয় নয়। বরং দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে আসা ছাত্রসংসদটি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছে, তারও একটি পরিমাপ।
সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক তারিকুল ইসলামের মতে, গতবারের নির্বাচন ছিল ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ ও পরিবর্তনের প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু এক বছর পর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়ায় সেই আগ্রহ আর আগের মতো নেই।
এক বছরে ১৩টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগতি। কিন্তু ৩০টি প্রতিশ্রুতি যদি কেবল কমিটি, সুপারিশ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে থাকে, তাহলে মেয়াদের শেষ নাগাদ সেগুলো বাস্তবে রূপ নেবে কি না এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ শিক্ষার্থীরা এখন হিসাব চাইবেন শুধু প্রতিশ্রুতির নয়, ফলাফলের। জাকসুর প্রথম বছরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই নির্বাচনের সময় একটি ইশতেহার আস্থা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই আস্থা ধরে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত কাজের দৃশ্যমান ফল, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি।
৩৩ বছর পর ফিরে আসা জাকসুর জন্য তাই আগামী সময়ের লড়াই শুধু বাকি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নয়; শিক্ষার্থীদের হারাতে বসা আস্থাটুকু পুনরুদ্ধারেরও।
সময়ের আলো/জোই