জাবিতে বাড়ছে মানসিক সংকট, সেবা দেওয়ার জায়গাই নেই

জাবি প্রতিনিধি

শিক্ষা

ক্লাসে মন বসছে না। রাতে ঘুম আসে না। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, কখনো

2026-09-11T12:49:29+00:00
2026-09-11T12:49:29+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষা
জাবিতে বাড়ছে মানসিক সংকট, সেবা দেওয়ার জায়গাই নেই
জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ক্লাসে মন বসছে না। রাতে ঘুম আসে না। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, কখনো পরিবারের সংকট, আবার কখনো সম্পর্কের টানাপড়েন— সব মিলিয়ে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছেন অনেক শিক্ষার্থী। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও তাদের অনেকেই নীরবে লড়ছেন মানসিক নানা সংকটের সঙ্গে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন সংকট দিন দিন দৃশ্যমান হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা, উদ্বেগ, একাকিত্ব, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, সম্পর্কের টানাপড়েন, ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের গত ছয় বছরের তথ্যেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে।

তবে সংকট যত বাড়ছে, ততটা বাড়েনি সেবা দেওয়ার সক্ষমতা। প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই আলাদা ও পূর্ণাঙ্গ কাউন্সেলিং সেন্টার। বর্তমানে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) দ্বিতীয় তলায় কোনো রকমে চলছে শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের কার্যক্রম। কিন্তু কাউন্সেলিংয়ের মতো সংবেদনশীল সেবার জন্য প্রয়োজনীয় নিরিবিলি ও ব্যক্তিগত পরিবেশ সেখানে নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে মোট ২ হাজার ৫৬২ জন শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ২০২০ সালে সেবা নেন ২০২ জন, ২০২১ সালে ২৫৮ জন, ২০২২ সালে ৬৪০ জন, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৬৭৫ জন, ২০২৪ সালে ৪৩৬ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৫১ জন।

অর্থাৎ করোনাকাল ও পরবর্তী সময়ে সেবা নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে এক বছরে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী সেবা নিয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৭৪ এবং ছাত্র ১ হাজার ১৮৮ জন।

বিষণ্নতা থেকে আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তা
কেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সেবা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, প্যানিক ডিজঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি), সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, অমূলক ভীতি, ঘুমের সমস্যা ও অতিরিক্ত মানসিক চাপের মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তা, রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, মাদকাসক্তি ও অন্যান্য জটিল মানসিক সমস্যার নিয়েও সেবা নিতে আসছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সমস্যার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেমস ও পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি, মাদকসেবন, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের টানাপড়েন, যৌন হয়রানি, শৈশবের মানসিক আঘাত, পরীক্ষায় খারাপ ফল, একাকিত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির মতো বিষয়গুলো ভূমিকা রাখছে।

করোনার পর বদলেছে সমস্যার ধরন
শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের উপপরিচালক (মনোবিজ্ঞান) ইফরাত জাহান বলেন, সেবা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের প্রথমে গোপনীয় তথ্যফরম পূরণ করানো হয়। এরপর একাধিক সেশনের মাধ্যমে সমস্যার ধরন শনাক্ত করা হয় এবং সে অনুযায়ী কাউন্সেলিং দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, করোনার আগের সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের সমস্যা দেখা যেত। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে সমস্যাগুলো পরিবর্তিত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলে।


নারী শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিংয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সমস্যা ও ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক সমস্যা বেশি দেখা যায়।

তবে কাউন্সেলিংয়ের পরিবেশ নিয়েই রয়েছে বড় সংকট। ইফরাত জাহান বলেন, আমাদের সেবাদান কেন্দ্র সেশন নেওয়ার জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে টিএসসিতে আশপাশের শব্দ এবং খোলামেলা পরিবেশের কারণে সমস্যা হয়। সেশনের পরিবেশ যদি নিরিবিলি হতো, শিক্ষার্থীদের আরও ভালোভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হতো।

শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকটের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবা কাঠামো যে অপ্রতুল, তা স্বীকার করছেন কেন্দ্রের কর্মকর্তারাও। শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, প্রথমত আমাদের পর্যাপ্ত রিসোর্স পারসন নেই। প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র দুজন মনোবিজ্ঞানী ও একজন ক্যারিয়ার কাউন্সেলর রয়েছেন।

তিনি বলেন, যারা আছেন তাদের বসার জায়গাও নেই। প্রাইভেসি নিয়ে যে কাউন্সেলিং করতে হয়, সে ধরনের রুম আমাদের নেই। এছাড়া শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রে বাজেট সংকটও প্রবল। ফলে একদিকে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার পরিধি বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিত জনবল, অপর্যাপ্ত বাজেট ও অনুপযুক্ত অবকাঠামোর কারণে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা আটকে আছে।

কাউন্সেলিংয়ের জায়গা বদলের পরিকল্পনা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিংয়ের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, আমাদের শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রকে নতুন একটা জায়গায় শিফট করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে কাউন্সেলিংয়ের উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায়। এটা নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করেছি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আবাসিক ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকা, আবাসিক জীবনের চাপ, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, সম্পর্ক ও সামাজিক নানা টানাপড়েন— সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

গত ছয় বছরের সেবা নেওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সেই চাপের একটি দৃশ্যমান চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু এই সংখ্যার বাইরেও এমন অনেক শিক্ষার্থী থাকতে পারেন, যারা সংকটে থাকলেও কাউন্সেলিং নিতে আসছেন না।

তাই শুধু একটি কেন্দ্র সরিয়ে নতুন জায়গায় নেওয়া নয় পর্যাপ্ত মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ, গোপনীয় ও নিরাপদ কাউন্সেলিং কক্ষ, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় বাজেট নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মানসিক সংকটে থাকা একজন শিক্ষার্থীর জন্য সময়মতো কথা বলার মতো একটি নিরাপদ জায়গাও কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   জাবি  মানসিক সংকট  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: