একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে সাধারণত একাধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক দক্ষতা যাচাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এবার এমন একটি নিয়োগ বোর্ড বসতে যাচ্ছে, যেখানে চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকছেন মাত্র একজন প্রার্থী। আর সেই একমাত্র প্রার্থীকে নিয়েই আগামীকাল রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বোটানি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ বোর্ডের সভা আহ্বান করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, একই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভাও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে নিয়োগ বোর্ডে সুপারিশের পর ওই সুপারিশ সিন্ডিকেটে তোলা হবে কি না এ নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করা হয়নি।
একজন প্রার্থীকে নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড আয়োজনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা। প্রশ্ন উঠেছে, চারজন আবেদনকারীর মধ্যে তিনজন বাদ পড়ার কারণ কী, তাদের যোগ্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড কী ছিল এবং একজনকে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াটি কতটা প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বোটানি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য গত ১৫ জুলাই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চারজন প্রার্থী আবেদন করেন। আবেদনকারীদের প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেছেন— এমন একজন প্রার্থীকে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে নিয়োগের পরবর্তী ধাপ হিসেবে সেই একজন প্রার্থীকে নিয়েই বোর্ড বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক। তাদের মতে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ করাই শেষ কথা নয়; বরং যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে তুলনামূলক মূল্যায়নের মাধ্যমে সর্বোচ্চ যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, মাত্র একজন প্রার্থীকে নিয়ে কোনোভাবেই নিয়োগ বোর্ড বসানো উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একাধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে যোগ্যতম ব্যক্তিকে বাছাই করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এখানে মাত্র একজন প্রার্থী থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়াটি কতটা প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ, সেটিই প্রশ্নের বিষয়।
তিনি বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী একাধিক প্রার্থী ছাড়া নিয়োগ বোর্ড না বসানোর একটি রীতি রয়েছে। অন্তত তিনজন প্রার্থী থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এখানে মাত্র একজন প্রার্থীকে নিয়েই বোর্ড আয়োজন করা হচ্ছে। এতে মনে হচ্ছে, নির্দিষ্ট একজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্যই পুরো প্রক্রিয়াটি আয়োজন করা হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
রোববার সকালে বোটানি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ বোর্ডের সভা হওয়ার কথা। একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভাও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এই সময়সূচি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কেউ কেউ। তাদের আশঙ্কা, নিয়োগ বোর্ডে সুপারিশের পর সেটি একই দিনের সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হতে পারে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অধ্যাপক বলেন, আবার একই দিনে সকালে নিয়োগ বোর্ড এবং পরে সিন্ডিকেট সভা থাকায় বিষয়টি নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বোর্ডে সুপারিশ করে তড়িঘড়ি করে তা সিন্ডিকেটে অনুমোদনের জন্য নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তার মতে, শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই, স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়নের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
তবে ‘মাত্র একজন প্রার্থী’—এমন অভিযোগের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, একজন নয়, আবেদন করেছিলেন চারজন। কিন্তু বাকিরা শর্ত পূরণ করতে পারেননি বিধায় মনে হয় একজনকে ডাকা হয়েছে।
তবে কোন কোন শর্ত পূরণ না করায় বাকি তিন আবেদনকারী বাদ পড়েছেন, তাদের যোগ্যতার ঘাটতি কী ছিল এবং একজন প্রার্থীকে নিয়োগ বোর্ডে ডাকার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে— এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (টিচিং) ড. বি. এম. কামরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের বিষয়ে মোবাইলফোনে কথা বলা যায় না। আমাদের অফিসে আসেন, সেখানে বসে কথা হবে।
শিক্ষক নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক মান, গবেষণা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকা নিয়ে সাধারণত গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাবির বোটানি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদে চারজন আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত একজন প্রার্থীকে নিয়ে নিয়োগ বোর্ড বসানোর সিদ্ধান্তে তাই একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে— বাকি তিনজন কেন শর্ত পূরণ করতে পারেননি, তাদের আবেদন কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, বাছাইয়ের মানদণ্ড কী ছিল এবং একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রেই কেন নিয়োগ বোর্ড আয়োজন করা হচ্ছে— এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
এর সঙ্গে একই দিনে সিন্ডিকেট সভার সময়সূচি যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক মহলে কৌতূহল আরও বেড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এখন দেখার বিষয়, রোববারের নিয়োগ বোর্ডে কী সিদ্ধান্ত হয় এবং একমাত্র প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করা হলে সেটি পরবর্তী সময়ে সিন্ডিকেটে কীভাবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে বাকি তিন আবেদনকারীকে বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং পুরো বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসন তার কতটা ব্যাখ্যা দেয়— সেদিকেও নজর থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের।
সময়ের আলো/জোই