জাবিতে নিরাপত্তার ২৪০ চোখ, নজরদারিতে নেই কেউ!

জাবি প্রতিনিধি

শিক্ষা

ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে একের পর এক সিসিটিভি ক্যামেরা। প্রবেশপথ থেকে প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবন থেকে শহিদ মিনার নজরদারির

2026-09-12T22:37:09+00:00
2026-09-12T22:37:09+00:00
 
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষা
জাবিতে নিরাপত্তার ২৪০ চোখ, নজরদারিতে নেই কেউ!
জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম 
জাবির সিসিটিভি ক্যামেরা। ছবি : সময়ের আলো
ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে একের পর এক সিসিটিভি ক্যামেরা। প্রবেশপথ থেকে প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবন থেকে শহিদ মিনার নজরদারির আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। বর্তমানে পুরো ক্যাম্পাসে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা প্রায় ২৪০টি।

কাগজে-কলমে নিরাপত্তার জন্য এটি বড় একটি অবকাঠামো। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়— এই ক্যামেরাগুলো সার্বক্ষণিক দেখছেন কে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক সিসিটিভি থাকলেও সেগুলোর ফুটেজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য নেই নিজস্ব স্থায়ী অপারেটর। নেই সার্বক্ষণিকভাবে সক্রিয় পৃথক কোনো মনিটরিং সেলও। ফলে ক্যামেরাগুলো অনেকটা ‘নীরব চোখ’ হয়েই পড়ে থাকে; কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রয়োজন অনুযায়ী ফুটেজ খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ক্যামেরা বাড়ছে, বাড়েনি নজরদারির সক্ষমতা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম বৃহৎ আবাসিক ক্যাম্পাস। বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগতদের চলাচল রয়েছে। বিভিন্ন প্রবেশপথ, আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য বরাবরই বড় চ্যালেঞ্জ।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে ক্যামেরার সংখ্যা প্রায় ২৪০।

কিন্তু শুধু ক্যামেরা স্থাপন করলেই নজরদারি কার্যকর হয় না। ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত, প্রয়োজনীয় ফুটেজ সংরক্ষণ এবং ঘটনার সময় দ্রুত তথ্য সরবরাহের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল ও একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। জাবিতে সেই জায়গাতেই রয়েছে বড় ঘাটতি।

ঘটনা ঘটলে শুরু হয় ফুটেজ খোঁজা
সিসিটিভির মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো ঘটনা ঘটার আগেই সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করা কিংবা ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তা নজরে আনা। কিন্তু সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে ক্যামেরার এই প্রতিরোধমূলক ভূমিকা অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়।

কোনো চুরি, ছিনতাই, হামলা, যৌন হয়রানি বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তখন সংশ্লিষ্ট স্থান ও সময়ের ফুটেজ খুঁজে বের করার প্রয়োজন পড়ে। এতে সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার পরপরই প্রয়োজনীয় ফুটেজ শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্যামেরা থাকলেও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রতিটি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়মিত দেখা সম্ভব হয় না। কোনো ঘটনা ঘটলে তখন সংশ্লিষ্ট সময়ের ফুটেজ বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থাৎ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি অনেকাংশে ‘ঘটনার পর নজরদারি’র ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

২৪০ ক্যামেরার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
একটি ক্যাম্পাসে শত শত ক্যামেরা স্থাপন করার পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। ক্যামেরা কেনা, স্থাপন, সংযোগ, রক্ষণাবেক্ষণ— সবকিছুর পরও যদি সেগুলোর ফুটেজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা না যায়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিশেষ করে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাহাঙ্গীরনগরে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ রাতদিন ক্যাম্পাসে অবস্থান করেন। রাতে অনেক সড়ক ও নির্জন এলাকায় মানুষের চলাচল কমে যায়। ফলে এসব এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ক্যামেরার সামনে কী ঘটছে, সেটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখার কেউ না থাকলে প্রযুক্তির সেই সুবিধা কতটা কাজে আসছে— এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

জাকসুর পক্ষ থেকেও উঠেছে আপত্তি
সিসিটিভির কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু)।

জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, সিসিটিভি অপারেটরের বিষয়টি প্রশাসনকে আগেই জানানো হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে নজরদারি না থাকলে সিসিটিভির পূর্ণ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যামেরাগুলো শুধু স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; সেগুলোর কার্যকর ব্যবহারের জন্য সার্বক্ষণিক অপারেটর ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

নিরাপত্তার ‘চোখ’ কেন সবসময় খোলা নয়?
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সিসিটিভি এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি অপরাধ প্রতিরোধ ও তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত উপায়। একটি ক্যামেরা অনেক সময় এমন তথ্য ধরে রাখতে পারে, যা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু সেই তথ্য সময়মতো কাজে লাগাতে হলে তিনটি বিষয় জরুরি— সার্বক্ষণিক নজরদারি, দ্রুত ফুটেজ শনাক্তকরণ এবং দক্ষ জনবল। জাবিতে ক্যামেরার সংখ্যা থাকলেও এই তিনটির সমন্বিত ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ঘটনার পর ফুটেজ দেখে অপরাধী শনাক্ত করার পাশাপাশি ক্যামেরার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ঘটনার সময়ই সন্দেহজনক আচরণ শনাক্ত করা। এজন্য প্রয়োজন একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা, যেখানে প্রশিক্ষিত কর্মীরা পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা ক্যামেরার দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করবেন।

শুধু ক্যামেরা নয়, দরকার পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভির পাশাপাশি আলোক ব্যবস্থা, নিরাপত্তাকর্মীদের কার্যকর টহল, প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

জাবিতে প্রায় ২৪০টি ক্যামেরা স্থাপন নিঃসন্দেহে নিরাপত্তা জোরদারের একটি বড় উদ্যোগ। কিন্তু ক্যামেরাগুলো যদি সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় না থাকে, তাহলে এই বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল কতটা মিলছে— সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

একটি ক্যামেরা দেখতে পারে, কিন্তু নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফুটেজে কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লেও সেটি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব মানুষেরই।

তাই এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে মূল প্রশ্ন ক্যামেরা আরও কতটি বসবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো— যে ২৪০টি ক্যামেরা ইতোমধ্যে বসানো হয়েছে, সেগুলোর সামনে ২৪ ঘণ্টা নজর রাখার মতো কার্যকর ব্যবস্থা কবে হবে?

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   ক্যাম্পাস  সিসিটিভি  ক্যামেরা  প্রবেশপথ  প্রশাসনিক ভবন  একাডেমিক ভবন  শহিদ মিনার  নজরদারি  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়  জাবি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: