ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় এখন ‘শাঁখের করাত’ হয়ে দেখা দিয়েছে। এটি একদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সংস্থান করলেও সড়ক-মহাসড়কে ডেকে এনেছে চরম বিশৃঙ্খলা। এসব ব্যাটারিচালিত রিকশার নৈরাজ্যে ভেঙে পড়েছে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। এ অবস্থায় করণীয় নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্যানসারের মতো এই রিকশা গ্রাস করছে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থাকে। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালকদের বেপরোয়া মনোভাবে আতঙ্কে থাকেন যানবাহন চালকরা। অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন নগরবাসী। রাজধানীসহ সারা দেশেই সড়কে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। লাইসেন্সবিহীন এসব অবৈধ বাহন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাজধানীজুড়ে প্রধান সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সব নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ট্রাফিক পুলিশের সামনে দিয়েই রাজধানীতে প্রতিনিয়ত অনায়াসে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।
জনবহুল ও যানজটের এই নগরে যেখানে বৈধ যানবাহন সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ সেখানে অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া চলাচলে নগরীর সড়কগুলোতে প্রতিদিনই তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। ঘটছে দুর্ঘটনাও। এমন পরিস্থিতিতে এসব অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও।
বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সংস্থান করেছে এসব অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা। কিন্তু রিকশার ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোসহ নানা কারণে এসব রিকশা নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছেন নীতিনির্ধারকরা।
প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে এসব রিকশা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, অটোভ্যান, লেগুনা ও মিশুকসহ বিভিন্ন তিন চাকার যানের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ৩৭৬ জন।
স্থানীয়ভাবে তৈরি নছিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু, মাহিন্দ্রা ও টমটম দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে আরও ৪৮৯ জন।
অভিযোগ আছে, এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, পুলিশ, আনসার ও নামসর্বস্ব কিছু সাংবাদিক টিনশেড গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নামিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ রিকশার মালিকই দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে একটি ‘শাঁখের করাত’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে এটি যেমন হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র সম্বল, অন্যদিকে এটিই শহরে চরম বিশৃঙ্খলা, যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর মিরপুরের একটি রিকশা গ্যারেজের ম্যানেজার জুয়েল বলেন, গত দুই থেকে আড়াই বছর ধরে অনেক মানুষ এই পেশায় যুক্ত হয়েছে। প্রকৃত রিকশাচালক বা ব্যবসায়ীরা ছাড়াও অনেক নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তও এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। অনেক বেকার তরুণও এখন রিকশা চালান বা ব্যবসা করেন।
এই গ্যারেজের রিকশাচালক নওগাঁর সোলায়মান হক জানান, গ্রামে কাজ করে যে অর্থ উপার্জন করা যায়, রিকশা চালিয়ে তার চেয়ে বেশি আয় করা যায়। তাই অনেকেই এখন এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহজ কর্মসংস্থান হলেও লাগামছাড়াভাবে এসব রিকশা পরিবহন ব্যবস্থা ও অর্থনীতির জন্যেও হুমকিস্বরূপ।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জান বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক দুঃসময়ে অনেক মানুষের জন্য রিকশা চালানোই হয়তো বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। কিন্তু একই সঙ্গে এই বিপুলসংখ্যক রিকশার কারণে যানজট সমস্যা প্রকট হচ্ছে এবং জনজীবনে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। প্রতিদিন রিকশার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা বা সরানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, এই অটোরিকশা যেভাবে পঙ্গপালের মতো সড়কে নেমেছে, আমার ধারণা এতে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। তার সঙ্গে এই যে চুরি করে বিদ্যুৎ, সেখানে একটা বিশাল রাজস্ব এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিও আছে। তাই এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই।
দুই বছরে লাগামছাড়া
২০২৪ সালের ১৯ মে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দেয়। এরপর থেকেই মূলত বাড়তে থাকে রিকশার সংখ্যা।
এরপর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশি কার্যক্রম ঢিলেঢালা হয়ে পড়ার সুযোগে রাজধানীর সব সড়কে অবাধে চলাচল শুরু করে রিকশা। তারপর আগস্ট মাসে উড়াল সড়ক, উড়াল মহাসড়ক ও বিমানবন্দরেও ব্যাটারি রিকশা চলতে শুরু করে।
এমন পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ঢাকা মহানগর এলাকায় তিন দিনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের আদেশ দেন। এরপর কয়েক দিন ঢাকায় বিক্ষোভ করে নগর অনেকটা অচল করে রাখেন রিকশাচালকরা।
পরে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে। ওই বছর ২৫ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ বা চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হাইকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই বিষয়বস্তুর ওপর এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দেন। ফলে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়। তারপর থেকে ওসব অবৈধ যানকে আর ঠেকানো যাচ্ছে না।
হিসাব নেই কারও কাছে
বর্তমানে রাজধানীসহ দেশজুড়ে কী পরিমাণ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে তার হিসাব নেই। এমন পরিস্থিতিতে এসব যান নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না। যদিও এসব ত্রিচক্রাকার যান চলাচলে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরির কথা বলা হচ্ছে। কারণ বিদ্যমান নীতিমালায় অনিরাপদ তিন চাকার যান চলাচলের সুযোগ নেই।
জানা যায়, বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা এক লাখ ৮২ হাজার ৬৩০টি আর উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ২৮ হাজার ১৫২টি। নিবন্ধিত দুই লাখ ১০ হাজার ৭০০ রিকশার সবই প্যাডেলচালিত।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডায়লগের তথ্য বলছে, দেশে ১০ লাখ প্যাডেলচালিত রিকশার বিপরীতে ব্যাঙের মতো জন্ম নিয়েছে ৬০ লাখেরও বেশি অটোরিকশা। এসব অবৈধ বাহন তৈরি করেছে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বাড়িয়েছে দুর্ঘটনা ও সড়কে মৃত্যুর হার।
যেভাবে শুরু
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১০ সালের পর থেকে চীন থেকে আমদানি করা ইজিবাইকের অনুকরণে রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করা শুরু হয়।
ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা খালেকুজ্জামান বলেন, ২০১১ সালের দিকে আমরা প্রথম এ ধরনের যান দেখতে পাই। রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করা হয়েছে সম্পূর্ণ স্থানীয় মিস্ত্রিদের দ্বারা।
বৈধ-অবৈধ বিদ্যুৎ
ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ সরবরাহ আগে অবৈধ থাকলেও এখন সেটার বৈধতা নিশ্চিত করছে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো।
ডেসকোর তথ্য অনুযায়ী, তাদের আওতায় বৈধ চার্জিং স্টেশন আছে ২ হাজার ২৬৩টি। প্রতিটি স্টেশনে প্রতিদিন ৩০ থেকে ২০০টি রিকশা চার্জ হয়। অন্যদিকে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) তথ্য অনুযায়ী কোম্পানির আওতায় বর্তমানে বৈধ চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা ২ হাজার ১৪৯।
তবে এর বাইরেও অনেক অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে এসব রিকশায় বৈদ্যুতিক চার্জ দেওয়া হয়। এরসঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের অসাধু বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত বলে অভিযোগ আছে।
ডাম্পিংয়েও কমে না
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৩৫ হাজার রিকশা ডাম্পিং করা হয়েছে । গড়ে প্রতিদিন ৩০০টির মতো অটোরিকশা বা ইজিবাইক ডাম্পিং জোনে পাঠানো হচ্ছে। তবুও রাস্তায় রিকশার সংখ্যা কমছে না। তবে ডাম্পিং নিয়েও বিস্তর অভিযোগ আছে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট জরিমানা দিয়ে ডাম্পিং রিকশা ফেরত নিয়ে আসার সুযোগ থাকায় এসব অবৈধ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
এ বিষয়ে বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস জানান, ব্যাটারি রিকশার অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ কোনোটাই বিআরটিএর হাতে নেই। তবে সড়ক নিরাপত্তায় ঝুঁকিপূর্ণ যানের নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. হাবিবুল আলম বলেন, ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। শিগগিরই তা কিছুটা সংশোধন করে ভেটিং শেষে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে একটি অনিয়ন্ত্রিত রূপান্তরিত যান যেখানে কোনো মানসম্মত মেকানিক্যাল ডিজাইন বা সেফটি কাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি। সাধারণ রিকশার ফ্রেমে মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত হওয়ায় ব্রেকিং সিস্টেম ও ব্যালান্সিং দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এসব যানকে নিষিদ্ধ না করে একটি নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ডের আওতায় এনে নিবন্ধন, ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড এবং ব্যাটারি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বৈধ অনুমোদন প্রাপ্তির জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশার নতুন নকশা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে