বিকেন্দ্রীকরণে কমবে চাপ

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেই রাজধানী ঢাকার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানসহ প্রায়

2026-09-13T02:17:28+00:00
2026-09-13T02:17:28+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
বিকেন্দ্রীকরণে কমবে চাপ
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১৭ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেই রাজধানী ঢাকার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানসহ প্রায় সবকিছুর কেন্দ্রও ঢাকা হয়ে ওঠায় রাজধানী এখন একসঙ্গে বহন করছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, যানজট, আবাসন সংকট, পরিবেশ দূষণ ও নাগরিক সেবার ওপর অসহনীয় চাপ। 

এর বড় একটি কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঢাকাকেন্দ্রিকতা। সরকারি যেসব দফতরের কাজের বড় অংশ দেশের অন্য অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, সেসব দফতরের প্রধান কার্যালয় ঢাকাতেই কেন রাখতে হবে সেই প্রশ্ন উঠেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সব মন্ত্রণালয় বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ঢাকার বাইরে নেওয়া সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের কার্যালয়, সচিবালয়, জাতীয় সংসদ এবং কূটনৈতিক মিশনসহ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাজধানীতেই থাকবে। কিন্তু যেসব অধিদফতর, কর্তৃপক্ষ ও সংস্থার কার্যক্রম নির্দিষ্ট অঞ্চল বা খাতভিত্তিক, সেগুলোর সদর দফতর বিভাগীয় শহরে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, নৌপরিবহন অধিদফতরের প্রধান কার্যালয় বর্তমানে ঢাকার আগারগাঁওয়ে। অথচ একই অধিদফতরের নৌ-বাণিজ্য দফতর, সরকারি সমুদ্র পরিবহন অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চট্টগ্রামে রয়েছে। 

সমুদ্রবন্দর, জাহাজ চলাচল, নৌ-বাণিজ্য ও মেরিটাইম কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই প্রতিষ্ঠানের সদর দফতরের বড় অংশ চট্টগ্রামে নেওয়া যায় কি না তা নতুন করে যাচাই করা যেতে পারে। এতে বন্দর, জাহাজ, নৌ-বাণিজ্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে নীতিনির্ধারণের সরাসরি সংযোগ বাড়বে। একইভাবে বর্তমানে নৌ-সদর দফতর বনানীতে। নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অবশ্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। 

তবে এখানে নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশল বিবেচনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুরো সদর দফতর স্থানান্তরের বদলে নৌবাহিনীর অপারেশন, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস ও মেরিটাইম পরিকল্পনার বড় অংশ চট্টগ্রামে শক্তিশালী করা যায় কি না সেটি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে যাচাই করা যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষি গবেষণার বড় অবকাঠামো ঢাকার বাইরে থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামোর উল্লেখযোগ্য অংশ ঢাকায়। কৃষিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ ময়মনসিংহ বা রাজশাহী অঞ্চলে নেওয়া হলে গবেষণা, মাঠ পর্যায়ের কাজ ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে দূরত্ব কমবে। 

ঢাকার বাইরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নেওয়ার প্রস্তাবের কথাও অতীতে আলোচনায় এসেছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, শিল্প নিরাপত্তা, শ্রম কমপ্লায়েন্সের মতো কার্যক্রম যেসব অঞ্চলে শিল্প-কারখানা বেশি, সেখানে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে এই অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি দেশজুড়ে জেলা কার্যালয় রয়েছে।

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি সাতটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। অর্থাৎ এর কার্যক্রম ইতিমধ্যে দেশজুড়ে বিস্তৃত। ভবিষ্যতে ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করে এর প্রশাসনিক ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বড় অংশ ঢাকার বাইরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার শহরের ভেতর থেকে কেরানীগঞ্জে নেওয়া বিকেন্দ্রীকরণের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। 

শহরের অত্যন্ত মূল্যবান জমি ব্যবহার করে কারাগার রাখার পরিবর্তে শহরের বাইরে বৃহত্তর ও নিরাপদ এলাকায় কারা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। কারা প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একইভাবে ঢাকার বাইরে অবকাঠামো তৈরি করার নজির রয়েছে। যেমন খুলনা বিভাগের কারা সদর দফতর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার ক্যাম্পাসে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় কেন্দ্রীয় কারাগার না থাকায় বিভাগীয় সদর দফতর যশোরে স্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের মডেল অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।


সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকার বাইরে সরানো হলে শুধু ঢাকার ওপর চাপ কমবে না, সংশ্লিষ্ট শহরেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাড়বে আবাসন, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা। ফলে দেশের উন্নয়ন আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানী ঢাকার ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক চাপ কমাতে হলে প্রশাসনিক খাতগুলোকে ধাপে ধাপে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। 

তবে এ বিকেন্দ্রীকরণ হতে হবে পরিকল্পিত ও কার্যভিত্তিক। অর্থাৎ কোনো মন্ত্রণালয় বা প্রশাসনিক দফতরকে এমন অঞ্চলে স্থানান্তর করা উচিত, যে অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তার মতে, মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক দফতরগুলোকে সংশ্লিষ্ট খাতের প্রধান কার্যক্রমের কেন্দ্রের কাছাকাছি স্থানান্তর করা হলে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে, অন্যদিকে ঢাকার ওপর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চাপও কমবে।

এর উদাহরণ হিসেবে কৃষি খাতের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দফতরগুলো ধীরে ধীরে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে স্থানান্তর করা যেতে পারে। কারণ দেশের কৃষি উৎপাদন ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে এই অঞ্চলটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একইভাবে শিল্প মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দফতরলোকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে চট্টগ্রামে, যেহেতু সবচেয়ে বেশি রফতানিকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় ওই অঞ্চলেই।

সাবেক সচিব বদিউর রহমান মনে করেন, রাজধানী ঢাকার ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক চাপ কমাতে হলে শিক্ষা, চিকিৎসা, বিচার ও প্রশাসনসহ নাগরিক জীবনের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।
তার মতে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাকে দেশের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলেও এখন সময় এসেছে পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার।

বড় বড় সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধান কার্যালয় ঢাকাতেই রাখতে হবে এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে সাবেক সচিব বদিউর রহমান বলেন, সংস্থার কাজের ধরন ও কার্যভিত্তিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বিভাগভিত্তিকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর সরিয়ে নেওয়া দরকার। ডিজিটাল যুগে তো এখন আর স্থান বড় বিবেচ্য হতে পারে না। প্রয়োজনে কিছু মন্ত্রণালয়ও বিভাগীয় পর্যায়ে স্থানান্তরিত হতে পারে।

তিনি মনে করেন, এককেন্দ্রিক সচিবালয় ব্যবস্থা ভেঙে প্রশাসনকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে শুধু প্রশাসনিক ভারসাম্যই প্রতিষ্ঠিত হবে না, একই সঙ্গে বিচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণও ত্বরান্বিত হবে।
তার মতে, এককেন্দ্রিক সচিবালয় ভাঙা হলে জনপ্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের ফলে জনপ্রশাসন সুষমভাবে দেশে বণ্টন তো হবেই, সঙ্গে বিচারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণে আর ঢাকায় চাপ থাকবে না।

এরশাদ আমলে করা উপজেলাকেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থা আবার চালু করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, উচ্চ আদালত অন্তত বিভাগগুলোয় আবার নেওয়া হোক। প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা হোক।

তবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিষ্ঠান ঢাকায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন,  জাতীয় সংসদ সচিবালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ঢাকায় থাকতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগও ঢাকায় রাখা যেতে পারে।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম মনে করেন, ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ শুধু প্রশাসনিক সদর দফতর স্থানান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না, এর সঙ্গে রাজধানীর আশপাশের নগর ও যোগাযোগব্যবস্থার পরিকল্পিত উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। 

এ ক্ষেত্রে তিনটি রিং রোডের মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে আশপাশের অঞ্চলগুলোর যোগাযোগ ও নগর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই রিং রোড ও স্যাটেলাইট শহর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন রাজধানীর চাপ কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে। তার মতে, সাভার ও গাজীপুরকে কার্যকর স্যাটেলাইট শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   বিকেন্দ্রীকরণ  চাপ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: