মরদেহ টুকরো টুকরো, ধারাবাহিক নৃশংসতা

আদিল সরকার

জাতীয়

শুধু হত্যাই নয়, ঠান্ডা মাথায় শরীর থেকে এক এক করে হাত-পা ও মাথাসহ অন্য অঙ্গ কেটে ফেলার মতো ভয়ংকর নৃশংসতা

2026-09-13T03:08:18+00:00
2026-09-13T03:08:18+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
মরদেহ টুকরো টুকরো, ধারাবাহিক নৃশংসতা
আদিল সরকার
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০৮ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
শুধু হত্যাই নয়, ঠান্ডা মাথায় শরীর থেকে এক এক করে হাত-পা ও মাথাসহ অন্য অঙ্গ কেটে ফেলার মতো ভয়ংকর নৃশংসতা যেন দিন দিন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে খুনিদের কাছে। পরবর্তীতে  এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পলিথিন, ব্যাগ ও লাগেজে ভরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে পুকুর, নদী, কালভার্ট কিংবা নির্জন কোথাও। 

দেশে প্রতিনিয়তই এমন খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত কয়েক মাসে অন্তত ১০টি এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যাতে ফুটে উঠছে নৃশংসতার সর্বোচ্চ ছাপ। তবে খুনিরা কি কেবল আলামত নষ্ট ও মরদেহ লুকানোর জন্য এমনটা করছে? শুধু এইটুকুই নয়। 

হত্যার পর মরদেহ টুকরো করার পেছনে রয়েছে খুনিদের ক্ষোভের সর্বোচ্চ বহির্প্রকাশসহ বিকৃত মানসিকতার মতো নানা কারণ। এমন ঘটনা না কমায় দিন দিন প্রশ্ন উঠছে দেশের আইনশৃঙ্খলার দিকে। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিটিরই তদন্ত করে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল একদিনেই দেশে এমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটা খণ্ডিত দুটি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া গত মাসে এমন একাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চলতি বছরে এমন প্রায় ১৫টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রাজধানীর আদাবর ১০ নম্বরের হাক্কার মোড় এলাকা থেকে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসময় তার দুই হাত ও মাথা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিক ওই নারীর নাম পরিচয় জানাতে পারেনি পুলিশ। 

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, খালপাড়ে দীর্ঘ সময় ধরে একটি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখে লোকজনের সন্দেহ হয়। পরে কৌতূহলবশত স্থানীয়রা ব্যাগটি টান দিলে প্রথমে ভেতর থেকে একটি হাত বেরিয়ে আসে। এরপর ব্যাগ থেকে একটি মাথা গড়িয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। আদাবর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন, স্কুলব্যাগের মতো একটি ব্যাগের ভেতর থেকে মস্তক, দুই হাত ও শরীরের অংশ পাওয়া গেছে। তবে খণ্ডিত দুই পা এখনও পাওয়া যায়নি। সেগুলোর সন্ধানে পুলিশ কাজ করছে। মরদেহের পরিচয় শনাক্তসহ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।

একই দিন ফরিদপুরের মধুখালীর রায়পুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের বোয়ালিয়া স্ট্যান্ড এলাকার একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে তিনটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরা এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের ৬ টুকরো মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ধানক্ষেতের পাশে একটি তালগাছের গোড়ায় তিনটি মুখ বাঁধা প্লাস্টিকের বস্তা দেখতে পান স্থানীয় পথচারীরা। বস্তাগুলো দেখে সন্দেহ হলে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি জানান। 

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে বস্তা তিনটির মুখ খুললে সেগুলোর ভেতর থেকে আনুমানিক ৪০ বছর বয়সি এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের লাশের ৬টি বিচ্ছিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়। নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

মধুখালী-বোয়ালমারী-আলফাডাঙ্গা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মাসুদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পরিচয় শনাক্ত না হলে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফনের জন্য আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।

এ ছাড়া তার আগের দিন শুক্রবার গাজীপুরের জয়দেবপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের একটি কালভার্টের নিচ থেকে লাগেজে ভরা অজ্ঞাত পরিচয় এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহের খণ্ডাংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। 


গত মাসে রাজধানীর সবুজবাগ থেকে এক নারীর খণ্ডিত মাথা ও পলিথিনে মোড়ানো বাহু থেকে বিচ্ছিন্ন দুই হাত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত লাশের মাথায় থাকা চুলে সোনালি রং ও ক্লিপ লাগানো ছিল। এ ছাড়া হাতে ট্যাটু আঁকা ছিল এবং কানে সোনালি রঙের দুল ছিল। ঘটনাটি ওই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। 

 চলতি বছরের রাজধানীর পল্টন-মতিঝিল এলাকায় ওবায়দুল্লাহ (৩০) নামে এক ব্যক্তির শরীরের বিচ্ছিন্ন অংশ, রাজধানীর মুগদা এলাকার একটি ভবনের বেজমেন্ট থেকে প্রথমে পলিথিনে মোড়ানো ৭ টুকরো মরদেহ উদ্ধার করে মানিকনগরের একটি ফাঁকা জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া দেশজুড়ে আলোচনায় আসে গত মে মাসে পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তার হত্যার ঘটনা। হত্যার পর শিশুটির মরদেহ খণ্ডিত করে গুমের চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ছাড়া জুনে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে নিখোঁজের ৬ দিন পর ১৪ বছর বয়সি স্কুলছাত্রী মারিয়া আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কবরস্থানসংলগ্ন ঝোপ থেকে অর্ধগলিত মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। আগস্টে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় কাস্টমসের নিরাপত্তা শাখার কর্মী রাকিব রায়হান তালুকদারের হত্যাকাণ্ডে খণ্ডিত মরদেহের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। নিখোঁজের ৯ দিন পর পরিত্যক্ত পুকুর থেকে তিনটি ব্যাগ ও বিছানার চাদরে মোড়ানো অবস্থায় তার ১৫ টুকরো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এটি অপরাধের পরবর্তী ধাপ— পরিচয় আড়াল, আলামত নষ্ট, মরদেহ সরানো এবং তদন্ত বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে নিয়েছে খুনিরা। আবার সব ঘটনার উদ্দেশ্য এক নয়। কোথাও ব্যক্তিগত অধিক শত্রুতা, কোথাও অর্থ আত্মসাৎ, কোথাও পারিবারিক বা সম্পর্কজনিত বিরোধের তথ্যও তদন্তে এসেছে। এ ছাড়া এই মরদেহ কাটার পেছনে তাদের মানসিক বিকৃতির কথাও বলছেন পুলিশ। সম্প্রতি রাজধানীসহ সারা দেশেই হত্যার পর মরদেহ খণ্ডিত করে এখানে সেখানে ফেলে দেওয়ার চিত্র যেন নাড়িয়ে দিয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলার ভিতকে।

আইয়ুব নামে এক পুলিশ পরিদর্শক প্রতিবেদককে বলেন, প্রতিটি ঘটনার মোটিভ ভিন্ন থাকে। হত্যার পর মরদেহ খণ্ডনের কোনো ঘটনা থাকে আলামত নষ্ট করা আবার কোনোটি থাকে সহজে মরদেহ লুকানোর। তবে এটি অবশ্যই নৃশংসতার চিত্র।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, হত্যার পর দেহ খণ্ডিত করার দুইটা কারণ বেশি কাজ করে। তারমধ্যে একটি হলো— যদি শত্রুতা বা শত্রুর প্রতি অনেক বেশি ক্ষোভ থাকে এবং আরেকটি হলো খুনির মানসিক বিকৃতি। অন্যথায় এমন করার কথা নয়। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   মরদেহ  টুকরো টুকরো  ধারাবাহিক  নৃশংসতা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: