যে শহর শুধু জায়গা নয়, অভ্যাসও

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

ঢাকার সকাল শুরু হয় মানুষের তাড়াহুড়োয়। কেউ বাস ধরতে দৌড়াচ্ছেন, কেউ রিকশার পেছনে ছুটছেন, কেউ অফিসের সময় বাঁচাতে রাস্তার মোড়ে

2026-09-13T02:11:58+00:00
2026-09-13T02:11:58+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
যে শহর শুধু জায়গা নয়, অভ্যাসও
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ঢাকার সকাল শুরু হয় মানুষের তাড়াহুড়োয়। কেউ বাস ধরতে দৌড়াচ্ছেন, কেউ রিকশার পেছনে ছুটছেন, কেউ অফিসের সময় বাঁচাতে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। ফুটপাথে চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, দোকানের শাটার উঠছে, পত্রিকার বান্ডিল খুলছে। দিনের শুরুতেই শহরটি যেন হাজার হাজার মানুষের শ্রম, স্বপ্ন আর উদ্বেগের ভার কাঁধে তুলে নেয়।

এই শহরে মানুষের অভাব নেই। মানুষই ঢাকার সবচেয়ে বড় পরিচয়। কেউ এখানে জন্মেছেন, কেউ এসেছেন জীবনের প্রয়োজনে। কেউ স্থায়ীভাবে সংসার গড়েছেন, কেউ ভাড়া বাসায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। কেউ প্রতিদিন ভোরে ঢাকায় ঢোকেন, কাজ শেষে আবার শহরের বাইরে ফিরে যান। কেউ এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে, কেউ চাকরি করতে, কেউ ব্যবসা করতে। আবার কেউ এসেছেন কেবল কয়েক দিনের জন্য— শহরটাকে দেখতে, পুরোনো ঢাকার গলি ঘুরতে, ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে। 

এত মানুষের শহর, অথচ প্রশ্ন থেকে যায়— এই বিপুল মানুষের কতজন সত্যিই ঢাকাকে আপন মনে করেন? ঢাকা কি তাদের কাছে কেবল জীবিকার জায়গা? কেবল একটি চাকরি, একটি ব্যবসা, একটি বাসা কিংবা প্রতিদিনের যাতায়াতের গন্তব্য? নাকি এর বাইরেও এই শহরের সঙ্গে তৈরি হয় কোনো অদৃশ্য সম্পর্ক?

প্রয়োজনের শহর : ঢাকার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের শুরুটা অনেক সময়ভালোবাসা দিয়ে নয়, প্রয়োজন দিয়ে। গ্রাম থেকে আসা একজন তরুণের কাছে ঢাকা মানে হয়তো একটি চাকরির সুযোগ। একজন তরুণীর কাছে উচ্চশিক্ষার ঠিকানা। 

একজন ব্যবসায়ীর কাছে বাজার। একজন শ্রমিকের কাছে দিনের মজুরি। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সন্তানের ভবিষ্যৎ। ঢাকায় এসে তারা প্রথমে শহরটিকে বোঝার চেষ্টা করেন না। বরং শহরের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
কোথায় কম ভাড়ায় বাসা পাওয়া যাবে, কোন বাসে গেলে অফিসে সময়মতো পৌঁছানো যাবে, কোথায় কম দামে বাজার করা যায়— এসব হিসাব দিয়েই শুরু হয় নগরজীবন। তারপর ধীরে ধীরে বদলে যায় হিসাব।

যে গলিটি প্রথমে অপরিচিত ছিল, সেটিই একসময় পরিচিত হয়ে ওঠে। যে চায়ের দোকানে প্রথম দিন কেবল চা খাওয়া হয়েছিল, কয়েক বছর পর সেখানে দোকানদার নাম ধরে ডাকেন। পাশের বাসার মানুষটির সঙ্গে হয়তো নিয়মিত দেখা হয়। রিকশাওয়ালার সঙ্গে দরদাম করতে করতে একসময় পরিচয় তৈরি হয়। অফিসে যাওয়া-আসার একই পথ হয়ে ওঠে প্রতিদিনের জীবনের অংশ। মানুষ তখন বুঝতে পারে— শহর কেবল জায়গা নয়; অভ্যাসও। আর অভ্যাসের সঙ্গে কখন যে মায়া জড়িয়ে যায়, তা টের পাওয়া যায় অনেক পরে।

ভাড়ার বাসাও একসময় ঘর হয়ে যায় : ঢাকার একটি বড় অংশের মানুষ ভাড়াটিয়া। তাদের কাছে শহরের সঙ্গে সম্পর্কের একটি বড় অধ্যায়জুড়ে থাকে ভাড়া বাসা।

একটি ছোট্ট ঘর। বারান্দা হয়তো নেই। জানালা খুললে পাশের ভবনের দেয়াল দেখা যায়। নিচে সারাক্ষণ গাড়ির শব্দ। তবু সেখানেই জন্ম নেয় সন্তান, সেখানেই স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় একটি শিশু, সেখানেই অসুস্থ রাতে কেউ মাথায় পানি ঢালে, সেখানেই ঈদের সকালে নতুন পোশাক পরা হয়।

বছরের পর বছর একই বাসায় থাকার পর বাড়িওয়ালার সঙ্গে সম্পর্ক হয়, পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কোনো এক দিন বাসা বদলাতে হলে দেখা যায়, মানুষটি শুধু একটি ঘর ছাড়ছেন না— ফেলে যাচ্ছেন অনেক স্মৃতি। ঢাকার অদ্ভুত ব্যাপার এখানেই। স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও এখানে মানুষের স্থায়ী স্মৃতি তৈরি হয়।

শহরটাকে কে মনে রাখে? : ঢাকার ব্যস্ততার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো এটাই— এখানে মানুষের থাকার সময় আছে, কিন্তু থামার সময় নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ ছুটছে। কাজ, পড়াশোনা, ব্যবসা, সংসার, বাজার, যানজট— সবকিছু মিলিয়ে দিনশেষ হয়ে যায়। একসময় শহরকে দেখার অভ্যাসটাই হারিয়ে যায়।

একই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যাওয়া হয়, কিন্তু রাস্তার পাশের পুরোনো গাছটির দিকে তাকানো হয় না। প্রতিদিন যে বাড়িটির পাশ দিয়ে যাওয়া হয়, সেটির বয়স কত— কেউ জানে না। যে পুকুরটি একসময় ছিল, সেটি কবে হারিয়ে গেছে, তা খেয়াল করারও সময় থাকে না। ঢাকার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যেন ধীরে ধীরে প্রয়োজনের তালিকায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। শহরের নামটি তখন কোনো অনুভূতি নয়, একটি গন্তব্য মাত্র।

তবু ঢাকার কিছু বিকাল আছে : সবকিছুর পরও ঢাকা মানুষকে টানে। কারণ এই শহরের আরেকটি মুখ আছে, যা ব্যস্ততার আড়ালে প্রায়ই ঢাকা পড়ে থাকে। শীতের সকালে কোনো পার্কে হাঁটতে থাকা মানুষ, বিকালে মাঠে খেলতে থাকা শিশুরা, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আড্ডা, পুরান ঢাকার অলিগলিতে খাবারের ঘ্রাণ, বৃষ্টির পর ভেজা রাস্তা, ছাদের ওপর সন্ধ্যার বাতাস— এসবও ঢাকার অংশ।

রমনার গাছের নিচে বসে থাকা মানুষ কিংবা কোনো লেকের পাশে সন্ধ্যার আলো দেখার জন্য কিছুক্ষণ থেমে থাকা তরুণ-তরুণী হয়তো কোনো অর্থনৈতিক কাজ করছে না। তারা শুধু শহরের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। সেই মুহূর্তগুলোতেই বোঝা যায়, মানুষ শহরকে শুধু ব্যবহার করতে চায় না। মানুষ শহরের সঙ্গে সম্পর্কও তৈরি করতে চায়। প্রশ্ন হলো— ঢাকা কি সেই সুযোগ দিচ্ছে?

মানুষের শহরে মানুষের জায়গা কতটুকু? : একটি শহর তখনই মানুষের হয়ে ওঠে, যখন সেখানে মানুষের জন্য জায়গা থাকে। শুধু গাড়ি চলার রাস্তা থাকলেই শহর বাসযোগ্য হয় না। দরকার হাঁটার পথ। দরকার গাছ। দরকার খেলার মাঠ। দরকার খোলা জায়গা। দরকার বসার স্থান। দরকার এমন কিছু জায়গা, যেখানে কোনো কারণ ছাড়াই মানুষ কিছুক্ষণ থাকতে পারে। ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো— এখানে থাকার জায়গা আছে, কিন্তু বেঁচে থাকার অবকাশ কমে যাচ্ছে।

উঁচু ভবন বাড়ছে, কিন্তু খোলা আকাশ কমছে। যানবাহন বাড়ছে, কিন্তু হাঁটার জায়গা কমছে। মানুষ বাড়ছে, কিন্তু একে অন্যের জন্য সময় কমছে। ফলে শহর যত বড় হচ্ছে, মানুষের একাকিত্বও কখনো কখনো তত বাড়ছে।

ঢাকার প্রতি মায়া তৈরি হয় কীভাবে? : কোনো শহরকে ভালোবাসতে হলে তাকে নিখুঁত হতে হয় না। বরং ভালোবাসা তৈরি হয় ছোট ছোট অভিজ্ঞতা থেকে।

প্রথম চাকরির দিনটি যে শহরে কেটেছে, সেই শহরকে মানুষ ভুলতে পারে না। প্রথম সন্তান যে হাসপাতালে জন্মেছে, সেই জায়গার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। যে রাস্তায় প্রতিদিন প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়েছে, সেটিও একসময় স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।

কেউ হয়তো ঢাকায় প্রথম নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে মায়ের জন্য শাড়ি কিনেছেন। কেউ প্রথম বই প্রকাশ করেছেন এখান থেকে। কেউ প্রথম প্রেমে পড়েছেন। কেউ আবার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছেন এই শহরের কোনো ছোট্ট ঘরে। এসব গল্প কোনো মানচিত্রে থাকে না। কোনো সরকারি নথিতেও লেখা থাকে না। তবু মানুষের মনে এগুলোই একটি শহরের আসল ইতিহাস।

ঢাকা একটু ভালোবাসা প্রাপ্য নয়? : আমরা প্রায়ই ঢাকার সমালোচনা করি। যানজট, শব্দদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, দখল, ভাঙাচোরা ফুটপাথ— সবকিছু নিয়েই অভিযোগ আছে।


অভিযোগের কারণও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শহরের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কতটুকু? শহরকে ভালোবাসা মানে শুধু শহরের প্রশংসা করা নয়। বরং তার প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। একটি গাছ না কাটা, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, ফুটপাথ দখল না করা, নদী-খালকে নোংরা না করা, অন্য মানুষের চলার জায়গাটুকু সম্মান করা— এসবও শহরকে ভালোবাসার ভাষা। আর সবচেয়ে বড় কথা, শহরের মানুষকে ভালোবাসা।

কারণ ঢাকা আসলে তার ভবন নয়, তার সড়ক নয়, তার বাজার নয়। ঢাকা তার মানুষ। রিকশাচালক থেকে চিকিৎসক, পোশাক শ্রমিক থেকে প্রকৌশলী, দোকানি থেকে শিল্পী— অসংখ্য মানুষের জীবন একসঙ্গে মিশেই এই নগর।

শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয় : ঢাকার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় অন্যায় হয়তো হলো— আমরা তাকে শুধু প্রয়োজনের চোখে দেখি। যতদিন কাজ আছে, ততদিন ঢাকা দরকার। যতদিন আয় আছে, ততদিন ঢাকা দরকার। যতদিন পড়াশোনা বা ব্যবসার প্রয়োজন, ততদিন ঢাকা দরকার। কিন্তু একটি শহরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এর চেয়ে বড় হতে পারে। একটি শহর মানুষের স্মৃতি ধারণ করতে পারে। ক্লান্তির দিনে আশ্রয় দিতে পারে। মানুষের স্বপ্নের সাক্ষী হতে পারে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের গল্প ধরে রাখতে পারে। ঢাকারও সেই সম্ভাবনা আছে। প্রশ্ন শুধু— আমরা কি তাকে সেই সুযোগ দিচ্ছি?

হয়তো একদিন এমন একটি ঢাকা দরকার হবে, যেখানে মানুষ শুধু দ্রুত চলবে না, একটু থামবেও। শুধু কাজ করবে না, অবসরও কাটাবে। শুধু আয় করবে না, সম্পর্কও তৈরি করবে। শুধু মাথা গোঁজার জায়গা খুঁজবে না, নিজের শহর বলে ভাবার মতো একটি জায়গাও খুঁজে পাবে। কারণ একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে, যখন তার মানুষ শুধু সেখানে বেঁচে থাকে না, সেখানে বাঁচার অর্থও খুঁজে পায়।

ঢাকার প্রয়োজন আরও অনেক উঁচু ভবন নয়। তার প্রয়োজন একটু বেশি মায়া। একটু বেশি সবুজ। একটু বেশি খোলা আকাশ।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   শহর  অভ্যাস  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: