বদলি মামলা নিয়ে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের হয়রানির যেন শেষ নেই। বদলি মামলা খুঁজে পাওয়া অনেক কষ্ট আর দুর্ভোগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় বদলি মামলা খুঁজে পেতে বছর পার হয়ে যায় বলে আইনজীবীদের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আদালতে কর্মরত দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
ছুটির দিন ব্যতীত সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত জটলা বেঁধে বদলি মামলা খুঁজতে দেখা যায় আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের। এমন চিত্র প্রতিনিয়ত দেখা যায় ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের সেরেস্তা তথা মামলা বদলি শাখার ভেতরে ও বাইরে। আর এতে করে বেশ হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের।
তবে ভুক্তভোগী আইনজীবীরা বলছেন, বদলি মামলার পুরো প্রক্রিয়া যদি উচ্চ আদালতের মত ডিজিটালাইজ করা যায় তা হলে এ দুর্ভোগ থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে বদলি মামলার গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জানতেই পারেন না, তার মামলার সবশেষ কী অবস্থা!
ফলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, মামলা খুঁজে পেতে বিলম্ব হওয়ার কারণে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হন। সবচেয়ে বড় বিষয়, ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলা বদলির আদেশের পর মামলার নথিটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো থেকে বদলি মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু করতে অনেক সময় লেগে যায়। আর এ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভোগান্তিতে পড়েন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা। মূলত চেক জালিয়াতি (চেক ডিজঅনার) মামলার ক্ষেত্রে এমনটি হয়ে থাকে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রথমে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি চেক জালিয়াতি মামলা করে থাকেন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাথমিক স্টেজে ওই মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারলেও আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে পাঁচ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে মামলাগুলোর বিচার ও নিষ্পত্তি করতে পারেন না।
তাই আইন অনুযায়ী সব মামলার বিচার শেষ করার ক্ষমতা এই আদালতের না থাকার কারণে চেক জালিয়াতির পাঁচ লাখ টাকার ঊর্ধ্বের মামলাসহ আরও অন্যান্য ধারার যে মামলাগুলোর বিচারিক ক্ষমতা এ আদালতের নেই সেই মামলাগুলো বিচারের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতের সেরেস্তায় বদলি করে পাঠানো হয়।
প্রতি সপ্তাহে এমন মামলার সংখ্যা ৯০০ থেকে ১০০০টি। সেকশনে আসার পর সেগুলো রিসিভ, স্বাক্ষর, আদালত নির্ধারণ করে বিচারিক আদালতে পাঠানোসহ যাবতীয় কাজ সনাতন পদ্ধতিতে (ম্যানুয়ালি) সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ একটি নিবন্ধন (রেজিস্টার) খাতায় লিখিতভাবে সংরক্ষণ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা।
অন্যদিকে মামলার তুলনায় অপর্যাপ্ত জনবল ও স্থান সংকুলান না হওয়ায় ওই শাখা থেকে বদলি রেজিস্টারে উঠিয়ে বিচারিক আদালতে বিচারের জন্য পাঠাতে সময় লাগে পাঁচ-ছয় মাসেরও অধিক সময়। এরপর শুরু হয় আইনজীবীদের মামলা খোঁজার পালা। মামলাটি কোন বিচারিক আদালতে গেল সেটি খুঁজে পেতে আইনজীবীদের দীর্ঘ সময় এবং নানা হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়।
বদলির ওই মামলা খুঁজতে দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট শাখায় ধরনা দিতে হয়। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর নিবন্ধন খাতায় এক এক করে খুঁজে দেখতে হয় কোন মামলা কোথায় বদলি হলো আর না পেলে মন খারাপ ও হতাশা নিয়ে ফিরে যেতে হয় তাদের।
ভুক্তভোগী আইনজীবীরা জানান, যেদিন মামলার বদলি হয়, তার কয়েক মাস পর থেকে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। এভাবে চলতে থাকে পাঁচ থেকে ছয় মাস। আর বিচারপ্রার্থীরা এ সময় মামলার অগ্রগতি জানতে ফোন দেন। কিন্তু কিছু জানাতে না পারায় তারাও ভুল বোঝেন। তাদের সঙ্গে শুরু হয় টানাপোড়েন। বিচার কার্যক্রমেও দেখা দেয় দীর্ঘসূত্রতা।
সম্প্রতি ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের সংশ্লিষ্ট সেকশনে বদলি মামলা খুঁজতে আসেন আইনজীবী হুমায়ুন কবির শাহ। তিনি বলেন, চার মাস আগে সিএমএম আদালত থেকে আমার চেক জালিয়াতির (চেক ডিজঅনার) পাঁচটি মামলা মহানগর আদালতে বিচারের জন্য বদলি হয়ে এসেছে। এখনও তা বদলির লিস্টে ওঠেনি। মামলাগুলো খোঁজার জন্য প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দুবার আসতে হয়। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তা খুঁজতে হয়, সহজে পাওয়া যায় না।
মোস্তফা কামাল নামে আরেক ভুক্তভোগী আইনজীবী বলেন, বদলি মামলা খুঁজে পাওয়া এত সহজ নয়। আমারও চারটি মামলা পাঁচ মাস আগে বদলি হয়ে এসেছে— এখনও সেগুলো খুঁজে পাইনি। তার মতে দৈনন্দিন রুটিনের সবচেয়ে কঠিন কাজ বদলি মামলা খুঁজে বের করা। তিনি আরও বলেন, উচ্চ আদালতে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হলেও নিম্ন আদালতে এর ব্যবহার এখনও পুরোপুরি লক্ষ্য করা যায় না। কিছু কিছু আদালতের বিচারক সাক্ষীর জবানবন্দি, আদেশ ও রায়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সহায়তা নেন। যদি বদলি মামলার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয় তা হলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমে আসবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু হাসান সময়ের আলোকে বলেন, প্রতি সপ্তাহে অসংখ্য মামলার বদলি-সংক্রান্ত নথি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতের সেকশনে আসে। এগুলো রিসিভ, স্বাক্ষর, আদালত নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোসহ যাবতীয় কাজ ম্যানুয়ালি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে নিম্ন আদালত থেকে বদলি মামলার নথি পাওয়ার ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই পুরো কাজ মনিটরিং করে থাকেন একজন বিজ্ঞ বিচারক। তিনি বলেন, যদি মামলা বদলির প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করা হয়, তা হলে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব। আমরা যত দূর সম্ভব দ্রুত কাজ করার চেষ্টা করি। তারপরও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, বিচারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে যে পরিমাণ মামলা আসে তা গ্রহণ করে বিচারিক আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়াটি আসলেই অনেক বিলম্বের। তার কারণ হলো, মামলার তুলনায় আদালতের স্টাফ অনেক কম। অনেক মামলা বদলি হওয়ায় তা ম্যানুয়ালি খাতায় ওঠাতে একটু সময় লাগে। এটি যদি ডিজিটালাইজ করা যেত তা হলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি অনেকটা কম হতো।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল কালাম খান বলেন, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে যে মামলাগুলো দায়রা জজ আদালত ও মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারের জন্য বদলি হয়ে আসে সেই মামলাগুলো খুঁজে পেতে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। মামলাগুলো এখনও এনালগ পদ্ধতিতে খাতায় নথিভুক্ত করা হয়। এতে করে সময় আরও বেশি লাগে। তাই মামলা বদলির প্রক্রিয়াটি ডিজিটালাইজ হওয়া সময়ের দাবি।
সময়রে আলো/প্রন্টি/এসএকে