পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট তৈরির অভিযোগ, জাবি মেডিকেলে তোলপাড়

জাবি প্রতিনিধি

শিক্ষা

রক্ত পরীক্ষা করানো হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারে। হাতে পাওয়া রিপোর্টে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১৫ দশমিক ৭। ফলাফল নিয়ে

2026-09-13T20:15:10+00:00
2026-09-13T20:15:10+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষা
পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট তৈরির অভিযোগ, জাবি মেডিকেলে তোলপাড়
জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:১৫ পিএম 
পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট তৈরির অভিযোগ, জাবি মেডিকেলে তোলপাড়। ছবি : সংগৃহীত
রক্ত পরীক্ষা করানো হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারে। হাতে পাওয়া রিপোর্টে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১৫ দশমিক ৭। ফলাফল নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় একই পরীক্ষা করা হয় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে রিপোর্ট আসে ৮ দশমিক ৮। এরপর পুরোনো চিকিৎসার তথ্যও সামনে আনেন শিক্ষার্থী। তার দাবি, গত ১০ বছরে তার হিমোগ্লোবিন কখনোই ১০-এর বেশি ছিল না।

শুধু ফলাফলের এই বড় ধরনের পার্থক্যই নয়, ঘটনাটি নিয়ে মেডিকেল সেন্টারে খোঁজ নিতে গিয়ে পরীক্ষার নথি না পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার সময় নিয়েও পাওয়া গেছে নথির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের অসংগতি। সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারে রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট প্রস্তুত ও সরবরাহের অভিযোগ এখন তদন্তের মুখে।

এ ঘটনায় মেডিকেল সেন্টারের দুই টেকনিক্যাল অফিসার ও এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. রাশেদ শেখ। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের পর বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠনের আশ্বাস দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন


রিপোর্টে ১৫.৭, অন্য হাসপাতালে ৮.৮
অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, গত ১১ আগস্ট জাবির কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারে নিজের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করান রাশেদ শেখ। পরে পাওয়া রিপোর্টে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা উল্লেখ করা হয় ১৫ দশমিক ৭।

রাশেদের কাছে ফলাফলটি অস্বাভাবিক মনে হলে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে একই পরীক্ষা করান। সেখানে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পাওয়া যায় ৮ দশমিক ৮।

রাশেদের ভাষ্য, গত এক দশকে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কখনো ১০-এর ওপরে ওঠেনি। ফলে জাবি মেডিকেল সেন্টারের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে তার সন্দেহ তৈরি হয়।

তবে তখন অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষা চলায় তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি বলে জানান তিনি।


‘যন্ত্র নষ্ট ছিল’— কিন্তু নথিতে মিলছে না
রোববার সকালে বিষয়টি নিয়ে মেডিকেল সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত চিফ মেডিকেল অফিসার (সিএমও) ডা. মো. শামসুল আলম খান লিটনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন রাশেদ। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমও দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই টেকনিক্যাল কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানতে চান।

রাশেদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন জানান, ওই সময়ে মেডিকেল সেন্টারের প্যাথলজি বিভাগের যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় পরীক্ষার ফলাফলে ভুল হয়ে থাকতে পারে।

একই বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা খন্দকার জাহাঙ্গীর আলমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনিও যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার কারণে ভুল ফলাফল হয়ে থাকতে পারে বলে জানান এমন দাবি করেন রাশেদ।

কিন্তু পরে শিক্ষার্থীরা যন্ত্রপাতি নষ্ট ও প্রতিস্থাপনের সময়ের লিখিত নথি দেখতে চান। সেখানেই তৈরি হয় নতুন প্রশ্ন।


১১ আগস্ট পরীক্ষা, যন্ত্র নষ্ট ১৫ আগস্ট!
শিক্ষার্থীদের দাবি, মেডিকেল সেন্টারের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ১৫ আগস্ট নষ্ট হয় এবং ১৮ আগস্ট নতুন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হয়।

অর্থাৎ রাশেদের দাবি অনুযায়ী, তার রক্ত পরীক্ষা হয়েছে ১১ আগস্ট। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার যে কারণ দেখানো হয়েছে, নথিতে তার সঙ্গে সময়ের মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন— যদি ১১ আগস্ট যন্ত্রপাতি নষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে ওই দিনের পরীক্ষার ফলাফলে ভুলের কারণ কী?

অন্যদিকে রাশেদের অভিযোগ, ১১ আগস্টের রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট তথ্য দেখতে চাইলে প্রথমে তথ্য থাকার কথা জানানো হলেও প্রায় তিন ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর কোনো হার্ডকপি বা সফটকপি দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া ১১ আগস্ট যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার দাবির সমর্থনে কোনো লিখিত নথি বা বিজ্ঞপ্তিও দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ তার।


রিপোর্টের তারিখ নিয়েও প্রশ্ন
ঘটনাটিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে রিপোর্ট প্রস্তুতের তারিখ। অভিযোগকারীর দাবি, তার রিপোর্টে প্রস্তুতের তারিখ দেওয়া হয়েছে ১২ আগস্ট। অথচ ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ফলে শিক্ষার্থী ও উপস্থিত অন্যদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে— পরীক্ষার নমুনা গ্রহণ, পরীক্ষা সম্পন্ন এবং রিপোর্ট প্রস্তুতের পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল?

তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট নথি, পরীক্ষার নমুনা গ্রহণের তথ্য, ল্যাব রেজিস্টার, যন্ত্রের ব্যবহার-সংক্রান্ত তথ্য এবং রিপোর্ট প্রস্তুতের প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবাদের মুখে মেডিকেল সেন্টারে উত্তেজনা
রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট ও যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রশ্নের জেরে একপর্যায়ে মেডিকেল সেন্টারে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা মেডিকেল সেন্টারের একটি অফিস কক্ষ তালাবদ্ধ করে দেন।

পরে সেখানে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম, প্রক্টর অধ্যাপক জাকির হোসেন, সহকারী প্রক্টর আবদুছ সাত্তার জয়, জাকসুর খাদ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক হুসনি মোবারকসহ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী।

পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা মেডিকেল সেন্টারের যন্ত্রপাতি নষ্ট ও প্রতিস্থাপন-সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করেন। সেখানে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে ১১ আগস্টের পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ওঠা দাবির অসঙ্গতি নিয়েই মূলত নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ
এ ঘটনায় মেডিকেল সেন্টারের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড ইমিউনোলজি ল্যাবরেটরি বিভাগের টেকনিক্যাল অফিসার কে. এম. নাজমুল হোসাইন রাসেল, হেমাটোলজি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিভাগের টেকনিক্যাল অফিসার মো. নাঈমুল ইসলাম নাঈম এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা খন্দকার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন রাশেদ শেখ।

তবে অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। তাই তদন্তের আগে কাউকে দায়ী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম বলেন, মেডিকেল একটি সংবেদনশীল স্থান। এখানে কোনো অনিয়ম বা অসংগতি অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রাথমিক তদন্তে রিপোর্টে ভুল তথ্য প্রদান এবং যন্ত্রপাতি নষ্ট ও প্রতিস্থাপনের তারিখের মধ্যে অমিল পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজকের সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করে অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পুরোনো অভিযোগও সামনে
এদিকে মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম এবং বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড ইমিউনোলজি ল্যাবরেটরির টেকনিক্যাল অফিসার কে. এম. নাজমুল হোসাইন রাসেল নিয়মিত অফিসের নির্ধারিত সময়ের পরে আসেন।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টার একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে একটি পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়েও যদি প্রশ্ন ওঠে, তার প্রভাব শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না— আস্থার সংকট তৈরি হয় পুরো চিকিৎসাসেবাকে ঘিরে। তাই রাশেদের অভিযোগের সত্যতা, রিপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া, ল্যাবের নথি এবং যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন নজর শিক্ষার্থীদের।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   পরীক্ষা  রিপোর্ট  অভিযোগ  জাবি  মেডিকেল  তোলপাড়  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: