দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী করতে চীন তৈরি করেছে পিংলু খাল। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে এই খালে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ চলাচল শুরু হচ্ছে।
চীনের প্রথম আধুনিক নদী-থেকে-সমুদ্র খাল হিসেবে পিংলু দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি নতুন বাণিজ্যপথ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে চীনের ভেতরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে পণ্য আগের তুলনায় কম দূরত্বে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছাতে পারবে।
কোথায় অবস্থিত পিংলু খাল?
পিংলু খাল পুরোপুরি চীনের দক্ষিণাঞ্চলের গুয়াংশি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত। অঞ্চলটি ভিয়েতনামের সীমান্তের কাছে এবং দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে মুখ করে রয়েছে।
প্রায় ১৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথ শিজিয়াং নদীকে বেইবু উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বেইবু উপসাগর টনকিন উপসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশ, যা দক্ষিণ চীন ও উত্তর ভিয়েতনামের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত।
এই খালের ফলে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান ও কুইঝৌসহ বিস্তীর্ণ এলাকার পণ্য আরও সহজে সমুদ্রবন্দর ও এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে পৌঁছাতে পারবে।
পিংলু খাল হলো কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পর চীনে নির্মিত প্রথম এ ধরনের আধুনিক খাল। এটি চীনের নিউ ইন্টারন্যাশনাল ল্যান্ড-সি ট্রেড করিডোরের অংশ।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন প্রদেশের সঙ্গে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অঞ্চলগুলোকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই ল্যান্ড-সি ট্রেড করিডোর আবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ। বেল্ট অ্যান্ড রোড হলো সড়ক, রেলপথ, বন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর একটি বিশাল নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
৫৬০ কিলোমিটার পথ কমবে
পিংলু খালের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে পণ্য পরিবহনের পথ অনেকটা ছোট করে দেবে।
গুয়াংশির স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, খালটি চালু হলে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব প্রায় ৫৬০ কিলোমিটার কমে যাবে।
একই সঙ্গে পরিবহন খরচ প্রায় ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
গুয়াংশি সরকারের উপমহাসচিব ঝাং ঝিওয়েনের হিসাব অনুযায়ী, শুধু পরিবহন খরচ কমার কারণে বছরে ৫০০ কোটি ইউয়ানের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৭০ কোটি ডলার সাশ্রয় হতে পারে।
গুয়াংশি অঞ্চলের ভাইস চেয়ারওম্যান লু শিনিং এই সুবিধাগুলোকে বাস্তব ও সরাসরি অর্থনৈতিক লাভ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমবে এবং চীনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়বে।
পিংলু খালে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
এই প্রকল্প নির্মাণে আনুমানিক ৭২৭০ কোটি ইউয়ান খরচ হয়েছে, যা প্রায় ১০৮০ কোটি ডলারের সমান।
এর ফলে চীনের উপকূল থেকে অনেক দূরে থাকা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলো সমুদ্রপথের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটের আরও কাছে চলে আসবে।
চীনের বড় বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ
পিংলু খাল শুধু গুয়াংশি অঞ্চলকে সুবিধা দেবে না। এটি চীনের একটি বড় বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চংকিং, সিচুয়ান, কুইঝৌ ও ইউনানসহ চীনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে পণ্য বেইবু উপসাগরের বন্দর পর্যন্ত পৌঁছাবে। এরপর এসব পণ্য সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য বাজারে পাঠানো যাবে।
অর্থাৎ চীনের অভ্যন্তরের কোনো কারখানায় উৎপাদিত পণ্য প্রথমে নদী ও স্থলপথে বেইবু উপসাগরের বন্দরে যাবে। এরপর সেখান থেকে সরাসরি সমুদ্রপথে বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে।
চীন-দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বাণিজ্যে বড় প্রবৃদ্ধি
চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বাড়ছে। চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ৬৪ হাজার কোটি ডলার।
আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বাণিজ্য বেড়েছে ১৮ দশমিক ২ শতাংশ। পিংলু খালের দক্ষিণ প্রান্তে থাকা বেইবু গালফ বন্দরের কনটেইনার পরিবহন সক্ষমতাও গত কয়েক বছরে ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
২০১৭ সালে এই বন্দরের কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা ছিল প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার টিইইউ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬ হাজার টিইইউতে।
বর্তমানে এই বন্দর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের সঙ্গে সরাসরি নৌ যোগাযোগ রয়েছে।
খালকে ঘিরে তৈরি হবে নতুন শিল্পাঞ্চল
চীন শুধু পণ্য পরিবহনের জন্য খালটি ব্যবহার করতে চাইছে না। খালকে ঘিরে নতুন শিল্প ও ব্যবসা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করছে গুয়াংশি সরকার। এর নাম দেওয়া হয়েছে পিংলু ক্যানাল ইকোনমিক বেল্ট।
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অলৌহ ধাতু ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, আধুনিক পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত।
বন্দর ও পরিবহন নেটওয়ার্কের কাছাকাছি শিল্পাঞ্চল তৈরি করা হলে কারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বন্দরে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ দুটোই কমতে পারে।
খালটি চালু হওয়ার আগেই এই নতুন বাণিজ্যপথ ঘিরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সম্প্রতি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বড় শিল্প ও পরিবহন কেন্দ্র চংকিং থেকে সোডিয়াম বিসালফেট বহনকারী একটি ট্রেন গুয়াংশির রাজধানী নাননিংয়ের বন্দরে পৌঁছেছে।
খাল চালু হওয়ার পর দক্ষিণ ভিয়েতনামের কান থো বন্দরের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত খাল ব্যবহারে ফি নেই
খাল ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দিতে গুয়াংশি কর্তৃপক্ষ বিশেষ ফি ব্যবস্থা চালু করেছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পিংলু খালের তিনটি লক বা জলকপাট সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবে।
এরপর ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে প্রতি টন জাহাজ ধারণক্ষমতার জন্য প্রতিবার খাল পার হওয়ার সময় ১ ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ১৪ সেন্ট ফি নেওয়া হবে। এই পরীক্ষামূলক ফি ব্যবস্থা ২০৩১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালু থাকার কথা রয়েছে।
খালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, নদীপথে আসা জাহাজগুলোকে মাঝপথে পণ্য অন্য জাহাজে স্থানান্তর করতে হবে না। তারা সরাসরি ছিনঝৌ সমুদ্রবন্দরের জেটিতে পৌঁছাতে পারবে।
এর ফলে নদীপথ থেকে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা তৈরি হবে।
খাল নির্মাণে সরিয়ে নিতে হয়েছে হাজারো পরিবার
এত বড় একটি খাল নির্মাণ করতে গিয়ে স্থানীয় মানুষের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। খাল নির্মাণের জন্য গুয়াংশির বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার পরিবারকে তাদের বাড়িঘর ও জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চারটি কাউন্টি ও কাউন্টি-স্তরের শহর থেকে মোট ২ হাজার ৭৬৪টি পরিবার, অর্থাৎ ১১ হাজার ২২৮ জন মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
শুধু হেংঝৌতে ৩৬৮টি বাড়ি সরিয়ে নেওয়ার জন্য চুক্তি করা হয়। এসব বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৮৪ হাজার ২০০ বর্গমিটার এলাকা খালি করা হয় এবং সেখানে বসবাসকারী ১ হাজার ২২১ জনকে সাময়িকভাবে অন্যত্র রাখা হয়।
পুনর্বাসনের সময় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণের ওপর নির্ভর করা হয়নি। স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির বিষয়টি বিবেচনা করে তাদের জন্য ২১ ধরনের বাড়ির নকশা তৈরি করা হয়েছিল।
এসব বাড়ির নকশায় বসার ঘরের দিক, ফসল শুকানোর জায়গা, হাঁস-মুরগি বা অন্যান্য প্রাণী রাখার জায়গা এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক রাখার ঘরের মতো বিষয়ও বিবেচনা করা হয়েছে।
পুনর্বাসন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শহর শাপিংয়ে কিছু বাসিন্দাকে চারতলা বাড়ি দেওয়া হয়েছে। এসব বাড়ির আয়তন প্রায় ৪২০ বর্গমিটার। কিছু বাড়ির সামনের অংশে ব্যবসা করার জন্য দোকানের জায়গাও রাখা হয়েছে।
তবে নতুন বাড়ি পেলেও অনেক মানুষের মধ্যে পুরোনো গ্রাম ও জমি হারানোর কষ্ট রয়েছে।
শিনফু এলাকার ফেংহুয়াংপিং গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, এখন আর ফেংহুয়াংপিং নামে কোনো গ্রাম নেই। তবে পিংলু খালের কারণে ভবিষ্যৎ ভালো হবে— এমন আশাও রয়েছে।
কিছু পরিবার পুরোনো বাড়ির জায়গা থেকে বহু বছরের পুরোনো গাছও নতুন বসতিতে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে একটি ২১৭ বছরের পুরোনো কর্পূর গাছও রয়েছে।
পুনর্বাসনের পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র ৩৯ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্মাণকাজে চাকরি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ পিংলু খাল?
বিশ্ব বাণিজ্যে সমুদ্রপথের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ অঞ্চল রয়েছে, যেগুলোর ওপর অনেক দেশ নির্ভরশীল। এসব পথ কোনো কারণে বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এর একটি উদাহরণ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। তাই হরমুজ প্রণালিতে কোনো সংকট তৈরি হলে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিকল্প বাণিজ্যপথ ও সরবরাহব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন পাইপলাইন, গুদাম, রেলপথ, বন্দর ও পরিবহন করিডোর। পিংলু খালও চীনের এমন একটি উদ্যোগ।
এর মূল লক্ষ্য হলো চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পণ্য পৌঁছানোর জন্য আরও ছোট, দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচের একটি বিকল্প পথ তৈরি করা।
পিংলু খাল চীনের ভেতরের অঞ্চলকে সমুদ্রের সঙ্গে আরও কাছে নিয়ে এসেছে। আর এর মাধ্যমে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি নিজের পণ্য পরিবহনের জন্য একটি নতুন ও বিকল্প সমুদ্রপথ তৈরি করেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ