দেশের কৃষি উৎপাদন ও জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সার ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১০ লাখ টন সার এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। সার আমদানিতে ব্যয় হবে প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, আর পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। আর জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির প্রস্তাব উত্থাপন করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
প্রায় ৯ লাখ ৯৫ হাজার টন সার আমদানি : সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ থেকে মোট প্রায় ৯ লাখ ৯৫ হাজার টন সার আমদানির প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি সার রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তির আওতায় রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি সার এবং মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন করে দুটি লটে মোট ৮০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানি করা হবে। এ ছাড়া বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে ৫ লাখ টন ডিএপি, ২ লাখ ২০ হাজার টন এমওপি এবং ২ লাখ টন টিএসপি সার আনার প্রস্তাব রয়েছে।
রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ষষ্ঠ লটে রাশিয়ার জেএসসি ‘ফরেন ইকোনমিক করপোরেশন (প্রডিনটর্গ)’ থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতি টন সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮৩ দশমিক ৮০ মার্কিন ডলার। এতে মোট ব্যয় হবে ১৬৬ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ৪৫০ টাকা। কৃষি ভর্ভুকির জন্য বরাদ্দ বাজেট থেকে এ অর্থ পরিশোধ করা হবে।
বিএডিসি এর আগে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাশিয়া থেকে এমওপি সার আমদানির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছিল। আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত ২৪ মে নতুন করে চুক্তি নবায়ন করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারদর ও চুক্তিতে নির্ধারিত প্রাইসিং ফর্মুলার ভিত্তিতে এবারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে বিএডিসির এমওপি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১৬ হাজার টন। এর মধ্যে রাশিয়া থেকেই ৫ লাখ ৯৫ হাজার টন আমদানির লক্ষ্য রয়েছে। ইতিমধ্যে দেশটি থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন এমওপি আমদানি করা হয়েছে।
মরক্কো থেকে ৮০ হাজার টন ডিএপি : জিটুজি চুক্তির আওতায় মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস এসএ থেকে মোট ৮০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির প্রস্তাব রয়েছে। ৪০ হাজার টনের দুটি লটে এ সার আনা হবে।
প্রতি টন ডিএপির দর ৮৮৫ মার্কিন ডলার। প্রতিটি লটে ব্যয় হবে ৪৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ দুটি লটে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৮৭৪ কোটি ৭৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
বেসরকারি পর্যায়ে ৫ লাখ টন ডিএপি : বিভিন্ন দেশের উৎপাদকদের কাছ থেকে বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে আরও ৫ লাখ টন ডিএপি সার আমদানির প্রস্তাব রয়েছে। প্রতি টনের মূল্য ধরা হয়েছে ৯৩৮ মার্কিন ডলার। এ হিসাবে মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়াবে ৪৬ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার।
এ আমদানির জন্য ২০টি প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মরক্কো, রাশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, মিসর ও তিউনিসিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সার আমদানির কথা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে আমদানির পরিমাণ ১০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টন পর্যন্ত।
আরও ২ লাখ ২০ হাজার টন এমওপি : বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ২ লাখ ২০ হাজার টন এমওপি সার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এতে প্রতি টনের দাম ৩৯৮ দশমিক ৯৭ মার্কিন ডলার এবং মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার।
এ আমদানির জন্য ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে সুপারিশ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়া, কানাডা ও বেলারুশ থেকে এমওপি সার আমদানির কথা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে আমদানির পরিমাণ ৬ হাজার থেকে ৩০ হাজার টন পর্যন্ত।
আসছে ২ লাখ টন টিএসপিও : বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে ২ লাখ টন টিএসপি সার আমদানির প্রস্তাবেও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতি টনের দর ৭৫৬ মার্কিন ডলার এবং মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ১২ লাখ মার্কিন ডলার।
লেবানন, বুলগেরিয়া, মরক্কো, মিসর ও তিউনিসিয়া থেকে এসব সার আমদানির কথা রয়েছে। এ জন্য ১০টি প্রতিষ্ঠানকে সুপারিশ করা হয়েছে।
১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকার জ্বালানি তেল : কৃষি খাতের সারের পাশাপাশি দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণেও বড় অঙ্কের আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
জিটুজি পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ৫০ : ৫০ অনুপাতে জ্বালানি তেল আমদানির যে শর্ত ছিল, তা শিথিল করার প্রস্তাবও বৈঠকে অনুমোদন করা হয়েছে।
বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জিটুজি চুক্তির আওতায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার ক্ষেত্রে নেগোসিয়েশনে নির্ধারিত প্রিমিয়াম, পরিমাণ এবং বর্তমান রেফারেন্স প্রাইসের ভিত্তিতে আমদানির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুপারিশকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে চীনের ইউনিপেক, ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি এবং চীনের পেট্রোচায়না।
অতিরিক্ত কার্গো এলএনজি কেনার উদ্যোগ : জ্বালানি তেলের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি থেকে অতিরিক্ত এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি। আগামী ১০ নভেম্বর ওই এলএনজি কার্গো কেনার কথা রয়েছে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির একক দর নির্ধারণ করা হয়েছে জেকেএম ০.০২ মার্কিন ডলার। এ প্রস্তাবটিও উত্থাপন করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা