সর্বজনীন পেনশন বিস্তারে নানা উদ্যোগ সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমান ব্যবস্থায় পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত

2026-09-17T02:43:32+00:00
2026-09-17T02:43:32+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
সর্বজনীন পেনশন বিস্তারে নানা উদ্যোগ সরকারের
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৪৩ এএম 
সময়ের আলো গ্রাফিক
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমান ব্যবস্থায় পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত নমিনিকে পেনশন দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এবার সেই সুবিধার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তার স্বামী বা স্ত্রী আজীবন মাসিক পেনশন পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, স্বাস্থ্যবীমা চালু, বিশেষ পরিস্থিতিতে জমা অর্থ ফেরত নেওয়া এবং চাঁদার বিপরীতে ঋণ সুবিধা কার্যকর করার মতো উদ্যোগও সামনে আসছে।

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় ও বাস্তবসম্মত করতে এসব প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। আজ (১৭ সেপ্টেম্বর) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হতে পারে। অর্থমন্ত্রী পদাধিকারবলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালুর পর তিন বছর পার হলেও সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় যে হারে মানুষ যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে সে গতি দেখা যায়নি। ফলে বিদ্যমান কাঠামোর সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে গ্রাহকদের জন্য নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা, পরিবারের সুরক্ষা এবং জরুরি প্রয়োজনে জমা অর্থ ব্যবহারের সুযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মৃত্যুর পরও পরিবারের সুরক্ষা : বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার একজন গ্রাহক ৬০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর মাসিক পেনশন পেতে শুরু করেন। পেনশন গ্রহণের সময় গ্রাহকের মৃত্যু হলে তার নমিনি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই পেনশনের সমপরিমাণ অর্থ পাওয়ার সুযোগ পান। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর নমিনি গ্রাহকের ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত মাসিক পেনশন পান। এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতেই এবার পেনশনভোগী মারা যাওয়ার পর তার জীবিত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন ব্যবস্থায় পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তার স্বামী বা স্ত্রীর আজীবন পেনশন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বজনীন পেনশনেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, জনসাধারণের আগ্রহ বাড়াতে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে পেনশনারের মৃত্যুর পর তার স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে।

৫৫ বছরেই হতে পারে পেনশন প্রাপ্তি : সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রস্তাব হলো পেনশন প্রাপ্তির বয়স কমানো। বর্তমানে ৬০ বছর বয়সে মাসিক পেনশন পাওয়ার নিয়ম থাকলেও তা কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

তবে বয়স কমানোর প্রস্তাবের সঙ্গে চাঁদার পরিমাণ, পেনশনের পরিমাণ এবং তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ একই পরিমাণ অর্থ যদি কম সময়ের মধ্যে পেনশন হিসেবে বিতরণ করা হয়, তা হলে তহবিল ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক হিসাব-নিকাশ ও বিধিবিধানের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

তিন বছরেও নেই প্রত্যাশিত সাড়া : বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো। ইতিমধ্যে তিন বছর পার হলেও চারটি স্কিমে নিবন্ধনের হার প্রত্যাশার তুলনায় কম। এসব স্কিমে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন নিবন্ধিত হয়েছেন, আর জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

নিবন্ধনের বড় অংশই এসেছে ‘সমতা’ স্কিম থেকে, যা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের জন্য। এ স্কিমে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন যুক্ত হয়েছেন। তাদের জমার পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

অন্যদিকে প্রবাসীদের জন্য চালু করা ‘প্রবাস’ স্কিমে অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম। এখন পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ১৭১ জন প্রবাসী এই স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন। এই স্কিমে মোট জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

দেশের বিপুল সংখ্যক কর্মজীবী মানুষ ও প্রবাসীর তুলনায় এই সংখ্যা এখনও সীমিত। ফলে নতুন সুবিধা যুক্ত করে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।

জমা অর্থের বিপরীতে ঋণ সুবিধা : সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় গ্রাহকের জরুরি আর্থিক প্রয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আইনে বিশেষ প্রয়োজনে গ্রাহকের জমা অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ঋণের বিপরীতে যে সুদ প্রযোজ্য হবে, সেটিও গ্রাহকের হিসাবেই জমা হওয়ার কথা। কিন্তু আইনগত সুযোগ থাকার পরও এখন পর্যন্ত এই ঋণ সুবিধা বাস্তবে চালু হয়নি।

নতুন সংস্কারের অংশ হিসেবে এবার এই সুবিধা কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটি চালু হলে দীর্ঘমেয়াদি পেনশন সঞ্চয়কে একেবারে অচল বা স্পর্শ-অযোগ্য অর্থ হিসেবে না দেখে জরুরি প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কত শতাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে নেওয়া যাবে, কী হারে সুদ দিতে হবে এবং কীভাবে ঋণ পরিশোধ করা হবে— এসব বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

অক্ষম হলে পুরো টাকা ফেরতের প্রস্তাব : সর্বজনীন পেনশনে দীর্ঘমেয়াদি চাঁদা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেরই বড় প্রশ্ন থাকে— কোনো কারণে নিয়মিত চাঁদা দেওয়া সম্ভব না হলে কী হবে?

এই প্রশ্নেরও সমাধান হিসেবে নতুন প্রস্তাব সামনে এসেছে। অন্তত পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর কোনো গ্রাহক শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার কারণে পেনশন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে বিশেষ বিবেচনায় তার পুরো জমা অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় এ ধরনের এক্সিট সুবিধা নেই। ফলে নতুন প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের অনিশ্চয়তা কিছুটা কমতে পারে।

পেনশনারদের স্বাস্থ্যবীমার পরিকল্পনা
আগে থেকেই পেনশন ব্যবস্থায় বীমা সুবিধা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত থাকলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এবার পেনশনারদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালুর একটি খসড়া পরিকল্পনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, এ সুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে ১০ থেকে ২০ টাকার নামমাত্র প্রিমিয়াম নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির সুরক্ষাও যুক্ত হবে। এ ছাড়া পেনশন ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে শরিয়াহ ভিত্তিক সংস্করণ চালুরও প্রস্তাব করা হয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং এর মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ে। কারণ তিন বছর পর এই ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু নতুন সুবিধা যোগ করা নয়— মানুষের আস্থা ও অংশগ্রহণকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   সর্বজনীন পেনশন  বিস্তারে উদ্যোগ  সরকার  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: