ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন তিনটি কূপ খনন করছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। এর মধ্যে একটি দেশের প্রথম ও সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ। এসব কূপ থেকে আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের আশা করছে কর্তৃপক্ষ। এতে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কিছুটা স্বস্তি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে দেশে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের মধ্যে বুধবার বিকাল ৪টায় ২ হাজর ৬১০ মিলয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুরে তিতাসের ৩১ নম্বর কূপের খনন চলছে। ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতার এই কূপটি দেশের সবচেয়ে উচ্চচাপ ও উচ্চতাপসম্পন্ন অনুসন্ধান কূপ। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল খনন শুরু হয়ে ইতিমধ্যে ৪ হাজার ৬৩৭ মিটার গভীরতা পর্যন্ত কাজ হয়েছে। চলতি বছরেই খনন শেষ করে কূপটি থেকে দৈনিক অন্তত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার আশা করছে বিজিএফসিএল।
বর্তমানে তিতাসের ২৩টি কূপ থেকে দৈনিক গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। এসব কূপে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। পুরোনো কূপগুলোতে মজুদ ও চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমেছে। এ অবস্থায় উৎপাদন বাড়াতে ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ খননের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২৯ ও ৩১ নম্বর কূপের কাজ চলছে। ২৯ নম্বরের কাজ শেষ হলে একই রিগ দিয়ে ৩০ নম্বর কূপ খনন করা হবে।
গভীর অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব বলেন, খননকাজ সফলভাবে শেষ হলে তিনটি কূপ থেকে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। ২৯ নম্বর কূপটি আগামী দুই মাসের মধ্যে শেষ করার আশা রয়েছে। ৩১ নম্বর কূপে আরও তিন থেকে চার মাস লাগতে পারে। তবে গভীরতা ও উচ্চচাপ-উচ্চতাপের কারণে কারিগরি জটিলতা দেখা দিতে পারে। সব মিলিয়ে তিনটি কূপ আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
তিনি বলেন, তিতাসে এর আগে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ৩ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় উচ্চচাপের স্তর পাওয়ায় এর নিচে আর যাওয়া হয়নি। এবার ৫ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত খননের মাধ্যমে গভীর স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সিসমিক জরিপের ভিত্তিতে ওই এলাকায় প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিক বলেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে তিনটি কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ গ্যাসের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় খুব বেশি না হলেও এর মাধ্যমে এলএনজি আমদানির চাপ কমবে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে সরকারের ব্যয় প্রায় ১ টাকা হলেও আমদানি করা এলএনজির ক্ষেত্রে তা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ফলে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি না করায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
তিতাসের পাশাপাশি বিজিএফসিএলের অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন বাড়াতে বন্ধ কূপের ওয়ার্কওভার এবং নতুন কূপ খননের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
১৯৬২ সালে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি তিতাস গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। ১৯৬৮ সালে এখানে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়।
বেড়েছে গ্যাস সরবরাহ, কমেছে লোডশেডিং : দেশে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের মধ্যে বুধবার বিকাল ৪টায় ২ হাজর ৬১০ মিলয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বাস দেন যে, মঙ্গলবার থেকে গ্যাস সরবরাহ পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে। এরপর মঙ্গলবার রাত ৮টার হিসাবে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে ১০১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয় । এর সঙ্গে দেশীয় উৎসের ১৬০ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট যোগ হয়ে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ২৬২ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট।
এর আগে সোমবার রাত ১০টায় এলএনজি সরবরাহ ছিল ৯৮ কোটি ঘনফুট এবং মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৫৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। গতকাল দুপুর ১২টায় এলএনজি থেকে পাওয়া যায় ৯৯ কোটি ঘনফুট। ওই সময় মোট সরবরাহ ছিল ২৬১ কোটি ঘনফুট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। এ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় সারা দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতিরও অনেকটা উন্নতি হয়েছে। বুধবার ঢাকা ও সারা দেশে লোডশেডিং কমার খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আবাসিকে রান্নার চুলায় গ্যাস পাওয়ার কথা জানিয়েছেন গ্রাহকরা।
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস
সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। টার্মিনালের একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকের ওপর চাপ পড়ে।
মেরামতের পর ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা হলেও পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো না থাকায় সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে টার্মিনালের সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছিল না।
বুধবারের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এলএনজি সরবরাহ আরও বেড়েছে। সোমবার বিকাল ৪টায় এলএনজি সরবরাহ ছিল ৭৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। মঙ্গলবার রাত ৮টায় তা বেড়ে ১০১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট বৃদ্ধি। বুধবার বিকাল ৪ টায় গ্যাস সরবরাহ বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তবে গ্যাসের চাহিদা এখনও সরবরাহের চেয়ে বেশি। ফলে নিয়মিত এলএনজি কার্গো আমদানি নিশ্চিত না হলে সরবরাহে আবারও চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা