ভারতে হঠাৎ বেড়ে গেছে চিনির দাম। আর এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে এখন উৎসবের খরচ সামলাতে অন্য অনেক প্রয়োজনীয় খরচ কমানোর কথা ভাবতে হচ্ছে।
ভারতে উৎসবের সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক খুব গভীর। দীপাবলি, দুর্গাপূজা, দশেরা, নবরাত্রিসহ বিভিন্ন উৎসবে পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও মন্দিরে মিষ্টি বা প্রসাদ দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। ফলে উৎসবের সময় চিনির চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়।
কিন্তু এবারের উৎসবের মৌসুমে চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দেশটির বিভিন্ন বাজারে খুচরা চিনির দাম প্রতি কেজি ৭৫ রুপি পর্যন্ত উঠেছে। অথচ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনেক বাজারে একই পরিমাণ চিনির দাম ছিল প্রায় ৪০ রুপি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কেন বাড়ছে চিনির দাম?
ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি চিনি ব্যবহারকারী দেশগুলোর একটি। একই সঙ্গে দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি উৎপাদক। সাধারণত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পরও কিছু চিনি রপ্তানি করা সম্ভব হয়।
কিন্তু চলতি মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।
সরকারি হিসাবে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ভারতে প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখ টন চিনি উৎপাদন হতে পারে। এর আগে উৎপাদনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল ৩ কোটি ৪৩ লাখ টন। অর্থাৎ আগের হিসাবের তুলনায় উৎপাদনের পূর্বাভাস প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে।
সরকার বলছে, আখ চাষের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাত কম হওয়া উৎপাদন কমার প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি কিছু মজুতদার বাজারে সরবরাহ কমিয়ে বেশি দামে চিনি বিক্রির চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে কৃষকদের মতে, শুধু আবহাওয়াই এর জন্য দায়ী নয়।
আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক
পাঞ্জাবের আখচাষি মুকেশ চন্দ্রের মতে, আখ চাষ করে কৃষকদের আগের মতো লাভ হচ্ছে না। শ্রমিকের মজুরি, সেচ, পরিবহন, সার ও অন্যান্য কৃষি খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে।
এ কারণে কিছু কৃষক আখের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে চিনিকলগুলোতে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য আখের সরবরাহও কমে যাচ্ছে।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, চিনিকল থেকে অর্থ পেতে অনেক সময় দেরি হয়। ফলে ছোট কৃষকদের হাতে নতুন বীজ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বা পরবর্তী মৌসুমের জন্য বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না।
রোগ ও পানির সংকটও বড় সমস্যা
উত্তর প্রদেশের কৃষকেরা আখ চাষে রোগবালাই ও পানির সংকটের কথাও বলছেন।
কৃষকদের একটি বড় অংশ ‘কো-০২৩৮’ জাতের আখের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই জাতটি বর্তমানে লাল পচনসহ বিভিন্ন রোগ ও পোকার আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন।
একই জমিতে দীর্ঘদিন ধরে আখ চাষ এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মাটির গুণমানও কমছে। অন্যদিকে আখ চাষে প্রচুর পানি প্রয়োজন হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও চাপ বাড়ছে।
ইথানল উৎপাদন নিয়ে মতবিরোধ
চিনির দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে আখ থেকে ইথানল তৈরির বিষয়টি সামনে এসেছে।
কৃষকদের একটি অংশ মনে করছে, আখের কিছু অংশ ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করার কারণে চিনির জন্য আখের সরবরাহ কমেছে। তবে ভারত সরকার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ইথানল তৈরিতে ব্যবহৃত চিনির পরিমাণ বরং কমেছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় ১২ শতাংশ চিনি ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করা হলেও ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা প্রায় ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
ভারত জ্বালানি তেলের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত বাজার তৈরি করতে ইথানল উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল।
দাম কমাতে চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত
বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ভারত সরকার ৩১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত শুল্ক ছাড় দিয়ে ১০ লাখ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানির অনুমতি দিয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো, উৎসবের মৌসুমে বাজারে চিনির সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগের প্রভাব এখনো সীমিত। কারণ আমদানি করা হচ্ছে অপরিশোধিত চিনি, অথচ ভারতের বাজারে মূল চাহিদা পরিশোধিত চিনির।
অর্থনীতিবিদ সঞ্জয় কুমারের মতে, এই পদক্ষেপকে সরাসরি দাম কমানোর চেয়ে দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া ঠেকানোর ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
মিষ্টির দামও বাড়ছে
চিনির দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মিষ্টির বাজারে। ভারতে মিষ্টি শুধু খাবার নয়, উৎসব ও সামাজিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীপাবলি, বিয়ে কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মিষ্টি দেওয়া অনেক পরিবারের নিয়মিত রীতি।
পাটনার বাসিন্দা আমান জাসওয়াল জানান, এ বছর মিষ্টির দাম প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবারকে উৎসবের বাজেট নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে।
ভারতের মিষ্টির বাজারের বার্ষিক আকার ১১০ কোটি ডলারের বেশি। এর ৪০ শতাংশেরও বেশি বিক্রি হয় উৎসবের মৌসুমে। প্রচলিত অনেক মিষ্টিতে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত চিনি থাকে। তাই চিনির দাম বাড়লে মিষ্টির দামেও তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বেশি চাপ
চিনির মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। বিহারের ৪৩ বছর বয়সী শ্রমিক জয় কৃষ্ণ প্রতিবছর দীপাবলিতে পরিবারের জন্য লাড্ডু, বরফি ও কাজু কাটলি কিনে বাড়ি ফেরেন।
এবারও তিনি পরিবারের জন্য মিষ্টি কিনতে চান। কিন্তু চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় মিষ্টির দামও বাড়বে— এমন আশঙ্কায় তাকে পোশাক ও খেলনার মতো অন্যান্য কেনাকাটা কমানোর কথা ভাবতে হচ্ছে।
পরিবারের জন্য মিষ্টি কিনতে তিনি প্রতিদিনের যাতায়াতের খরচও কমাচ্ছেন। কর্মস্থল থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে থাকলেও পরিবহন খরচ বাঁচাতে হেঁটে যাতায়াত করছেন।
তার ভাষায়, ধনী মানুষদের উৎসব উদযাপনে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও দরিদ্র মানুষের জন্য পরিস্থিতি অনেক কঠিন।
সামনে উৎসবের মৌসুম
ভারতে আগস্টের শেষ দিক থেকেই উৎসবের মৌসুম শুরু হয়েছে। গণেশ চতুর্থী ও ওনামের পর অক্টোবর ও নভেম্বরে নবরাত্রি, দুর্গাপূজা, দশেরা ও দীপাবলি ঘিরে বাজারে কেনাকাটা আরও বাড়ার কথা।
এই সময়ে চিনির চাহিদাও বাড়বে। ফলে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে মিষ্টি ও অন্যান্য চিনিনির্ভর খাবারের দাম আরও বাড়তে পারে।
চিনি আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। তবে কৃষকদের উৎপাদন খরচ, আখ চাষে কম লাভ, রোগবালাই, পানি সংকট এবং চিনিকলের অর্থ পরিশোধে দেরির মতো সমস্যাগুলো সমাধান না হলে ভবিষ্যতেও চিনির সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হতে পারে।
ফলে এবারের উৎসবের মৌসুমে ভারতের সাধারণ মানুষের জন্য প্রশ্ন শুধু মিষ্টির দাম কত হবে, তা নয়— বাড়তি খরচ সামলে তারা কতটা উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন, সেটিও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ