ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী একসময় ছিল দেশটির উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় সক্রিয় একটি ছোট মিলিশিয়া। কিন্তু কয়েক দশকের সংঘাত, ইরানের সহায়তা এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
হুতিদের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রযাত্রায় বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকাও তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। ফলে ইয়েমেনের বাইরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও হুতিদের প্রভাব বেড়েছে।
যেভাবে শুরু
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে হুতি পরিবারের নেতৃত্বে জায়দি শিয়া মুসলিমদের একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে গোষ্ঠীটির যাত্রা শুরু হয়। পরে তারা ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে কয়েক দফা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী স্থানীয় মিলিশিয়ায় পরিণত হয়।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে হুতিরা আরও বেশি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। একই সময়ে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।
রাজধানী দখল ও সৌদি হস্তক্ষেপ
২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে এবং দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে চলা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেমে যায়।
এর পর হুতিদের ঠেকাতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলেও দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি।
লোহিত সাগরে হামলা
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজা যুদ্ধের সময় হুতিরা ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের কথা বলে ইসরায়েল ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী বিভিন্ন জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
এতে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মুখে পড়ার পর হুতিরা আবারও লোহিত সাগরের জাহাজ এবং সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় লড়াই শুরু হয়েছে। এর মধ্যে হুতিরা দক্ষিণ তিহামা এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। তারা মোচা বন্দর দখলের পর লোহিত সাগরের উপকূলের আরও এলাকা ও কয়েকটি দ্বীপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
এর ফলে প্রায় ১৯ কিলোমিটার প্রশস্ত বাব আল-মান্দেব প্রণালির পুরো উপকূলজুড়ে হুতিদের অবস্থান তৈরি হয়েছে। এই অবস্থান তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকে তারা লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নজরদারি বা হামলা চালানোর সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণে এডেনের দিকে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব সরকারপন্থী বাহিনীর সমর্থনে বিমান হামলা চালিয়েছে।
হুতিদের হাতে কী অস্ত্র আছে?
হুতিদের সামরিক শক্তির অন্যতম বড় দিক হলো তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেন থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরের ইসরায়েলেও পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের প্রধান বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় আঘাত করেছিল।
এ ছাড়া সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও স্থাপনা এবং লোহিত সাগরের জাহাজ লক্ষ্য করেও হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে তারা ড্রোনের ব্যবহারও বাড়িয়েছে। এসব ড্রোন দিয়ে যানবাহন ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালানোর ভিডিওও প্রকাশ করেছে তারা।
অস্ত্র আসে কোথা থেকে?
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা ইরানের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে এবং নিজেদের দেশেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেনে ব্যাপক অস্ত্র পাচার হয়েছে বলেও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থল ও সমুদ্রপথে অস্ত্র ও বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম আনার তথ্য পাওয়া গেছে।
ইরানের কিছু সূত্র জানিয়েছে, তেহরান হুতিদের অস্ত্র ও সামরিক বিশেষজ্ঞ দিয়ে সহায়তা করেছে। তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে হুতিদের অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইএসএসের ২০২৫ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, হুতিরা নিজেদের অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ালেও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও উন্নত সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে তারা এখনও ইরানের ওপর নির্ভরশীল।
কত বড় হুতিদের বাহিনী?
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, হুতিদের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ১৮ বছরের কম বয়সী তরুণদেরও যোদ্ধা হিসেবে নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
তাদের সামরিক কৌশলের মধ্যে রয়েছে ড্রোন হামলা, সামনের সারিতে গোলাবর্ষণ, শত্রু এলাকায় অনুপ্রবেশ এবং মাইন ও বিস্ফোরক ব্যবহার।
ইরান ও হিজবুল্লাহর প্রশিক্ষণও তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে ইয়েমেন বিষয়ক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ২০২৫ সালে হুতিদের সঙ্গে হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতির কথাও জানিয়েছিলেন।
কেন হুতিদের নিয়ে এত আলোচনা?
হুতিদের শক্তি এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েল পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া, সৌদি আরবের স্থাপনায় হামলা এবং লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ লক্ষ্য করার সক্ষমতা তাদের আঞ্চলিক প্রভাব অনেক বাড়িয়েছে।
অর্থাৎ, পাহাড়ি এলাকার একটি ছোট মিলিশিয়া থেকে হুতিরা ধীরে ধীরে এমন একটি সশস্ত্র শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাদের সামরিক কর্মকাণ্ড ইয়েমেনের পাশাপাশি সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ