গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে প্রায় ১০ মাস ধরে কোনো স্থায়ী বিচারক নেই। এই দীর্ঘ সময়ে আদালতে জমে থাকা প্রায় ৪ হাজার মামলার ভাগ্য এখন ঝুলে আছে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন বিচারকের ওপর, যিনি নিজের আদালতের কাজের চাপ সামলে সপ্তাহে সীমিত সময় সাদুল্লাপুরের মামলাগুলো দেখেন। ফলে দেওয়ানি, পারিবারিক ও ভূমি বিরোধের হাজারো মামলার বিচারপ্রার্থী এখন কার্যত হাজিরা ও নতুন তারিখ নেওয়ার বৃত্তেই আটকে আছেন।
গত বছরের নভেম্বরে আদালতের বিচারক আবু রায়হান বদলি হয়ে কুড়িগ্রাম জেলা জজ আদালতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই এই সংকটের শুরু। এরপর একাধিক বিচারককে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও কেউই নিয়মিত শুনানি পরিচালনা করতে পারেননি। বর্তমানে পলাশবাড়ী সহকারী জজ আদালতের বিচারক অতিরিক্ত দায়িত্বে সাদুল্লাপুরের বিচারকাজ চালাচ্ছেন বলে আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিদিন ৩০-৪০ মামলা, শুনানি হয় সামান্যই
আদালত সূত্র বলছে, প্রতিদিনের কার্যতালিকায় গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি মামলা থাকে। এর মধ্যে সাক্ষ্য গ্রহণ, সমন জবাব, যুক্তিতর্ক, অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা, বাটোয়ারা, পারিবারিক বিরোধ ও ভরণপোষণসংক্রান্ত মামলাও রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত বিচারক না থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রকৃত শুনানি হয় না; বাদী-বিবাদীরা হাজিরা দিয়ে বা পিটিশন জমা দিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আটকে থাকা মামলাগুলো এগোচ্ছে না, যুক্তিতর্ক পর্যায়ের মামলাতেও শুনানি স্থগিত হয়ে আছে। জরুরি নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়েও সিদ্ধান্ত পেতে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আদালতের অফিস সহকারী আনিছুর রহমান বলেন, ‘নিয়মিত বিচারক না থাকায় তালিকাভুক্ত অধিকাংশ মামলার কার্যকর শুনানি সম্ভব হচ্ছে না। বাদী-বিবাদীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েই আদালত ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।’
সুপ্রিম কোর্টে লিখিত আবেদন
এই দুর্ভোগের প্রতিকার চেয়ে গত ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন সাদুল্লাপুর উপজেলার বাসিন্দা ফিহাদ সরকার। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, জেলা জজ আদালত ভবনের তৃতীয় তলার ৩০২ নম্বর কক্ষে পরিচালিত এই আদালত সাদুল্লাপুরের বিচারপ্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘদিন পদ শূন্য থাকায় বিচারিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আদালতের জুডিশিয়াল হেল্পলাইন নম্বরও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যার ফলে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফিহাদ সরকার বলেন, ‘দু-চার মাস নয়, প্রায় ১০ মাস ধরে আদালতে স্থায়ী বিচারক নেই। শুনানির আশায় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আদালতে এলেও অনেক সময় কেবল হাজিরা দিয়েই ফিরতে হচ্ছে, অথচ প্রতিটি সফরেই আইনজীবী-মুহুরি ও যাতায়াতের পেছনে খরচ গুনতে হচ্ছে তাদের।’
বছরের পর বছর অপেক্ষায় বিচারপ্রার্থীরা
সাদুল্লাপুরের বনগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা আসমা বেগম প্রায় ২ বছর আগে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছিলেন। শুরুর দিকে বিচারক থাকায় মামলার অগ্রগতি হচ্ছিল, কিন্তু বিচারক না থাকায় তা থমকে গেছে বলে জানান তিনি। প্রতিবার আদালতে এসে হাজিরা দিয়ে ফিরে যেতে হয়, অথচ মামলার কোনো অগ্রগতি হয় না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
ভরণপোষণ মামলার বাদী রোজিনা খাতুন জানান, আদালতের আদেশে একবার ভরণপোষণের টাকা পেলেও পরে তা নিয়মিত পাননি। শিশুসন্তান কোলে নিয়ে বারবার আদালতে এসেও বিচারকের অনুপস্থিতিতে শুধু হাজিরা দিয়েই ফিরতে হচ্ছে তাকে। দ্রুত বিচারক নিয়োগ হলে তাদের মতো ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ কমবে বলে মনে করেন তিনি।
৭০ বছর বয়সী খোদেজা বেগমের বাটোয়ারা মামলা চলছে প্রায় ২ দশক ধরে। প্রতিপক্ষও ২০০৪ সালে পৃথক একটি বাটোয়ারা মামলা করেছিল, যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এর একটি মামলা সাক্ষ্য গ্রহণ এবং অন্যটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে থাকলেও গত দশ-এগারো মাসে একাধিক ধার্য তারিখেও বিচারকের অভাবে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানান তিনি।
২০২৪ সালে জমির দলিল সংশোধনের মামলা করা নুরুল আমিন মণ্ডল বলেন, তার মামলা প্রায় শেষ পর্যায়ে এলেও গত সাত-আট মাস ধরে শুনানির অপেক্ষায় আছেন। প্রতিবার আদালতে গিয়ে বিচারক নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
একইভাবে ইদিলপুর গ্রামের আঞ্জুয়ারা বেগমও পারিবারিক বিরোধের মামলায় দীর্ঘদিন কার্যকর শুনানি না পেয়ে আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন।
মামলা চলতে চলতেই মারা যাচ্ছেন বাদী-বিবাদী
শুধু বিচারপ্রার্থী নন, দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব পড়ছে আইনজীবীদের কাজেও। ভূমি বিরোধ সংক্রান্ত দুটি মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট অমল কুমার দাস জানান, দীর্ঘদিন মামলা চলতে চলতে উভয়পক্ষের একাধিক বাদী-বিবাদীর মৃত্যু হয়েছে। গত মে মাসে একজন বাদীর মৃত্যুর পর তার ডেথ সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশান সনদ আদালতে জমা দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক ও রায় ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কাজ বিচারক ছাড়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, তাই প্রতিটি আদালতে নিয়মিত বিচারক থাকা জরুরি।’
গাইবান্ধা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আশরাফুল আলম রঞ্জু বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন আদালতে বিচারক-সংকটে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষ করে সাদুল্লাপুর আদালতে দেওয়ানি, পারিবারিক, যৌতুক, ভরণপোষণ ও ভূমি বিরোধের মামলায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত নতুন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হলে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।’
দাবি একটাই- স্থায়ী বিচারক
বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, দেওয়ানি, পারিবারিক ও ভূমি সংক্রান্ত মামলায় এমনিতেই দীর্ঘসূত্রতা থাকে। এর ওপর বিচারকশূন্যতা যোগ হওয়ায় মামলার জট আরও বেড়েছে। নিয়মিত শুনানি না হওয়ায় সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি বাড়ছে মানসিক চাপও। তাদের একটাই দাবি- সাদুল্লাপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে অবিলম্বে একজন স্থায়ী বিচারক নিয়োগ করা হোক এবং জমে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হোক।
বিচারপ্রার্থীরা বলছেন, বছরের পর বছর শুধু হাজিরা ও পরবর্তী তারিখের অপেক্ষায় কাটাতে হলে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও দীর্ঘ হয়ে যায়। তাই প্রায় ১০ মাসের এই বিচারক সংকটের দ্রুত অবসান চান তারা।
সময়ের আলো/মহু