দীঘিটির নাম সুন্দরী কমলা রানীর দীঘি। প্রায় ৫৩১ বছরের পুরোনো। আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নে তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে। এই দীঘিটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে রয়েছে নানা লোকগাথা, ইতিহাস ও রাজপরিবারের আত্মত্যাগের কাহিনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী এই কমলা দীঘি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একটি টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপ রাজপরিবারের রাজা জয়দেবের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি তার বুদ্ধিমতী ও অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী কন্যা কমলা সুন্দরীকে রাজ্য পরিচালনায় দক্ষ করে তোলেন। পরে বাবুগঞ্জের বলভদ্র বসুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। রাজা জয়দেবের মৃত্যুর পর ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দে কমলা সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং প্রজাদের সুপেয় পানির কষ্ট দূর করতে একটি বিশালাকার দীঘি খননের নির্দেশ দেন। তৎকালে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই দীঘির পাড় ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট উঁচু যা বঙ্গপ্রদেশে এক বিরল স্থাপত্য দৃষ্টান্ত ছিল।
দীঘিটি নিয়ে এলাকায় বহুল প্রচলিত এক অলৌকিক উপাখ্যান রয়েছে। স্থানীয়দের কথায়, খননকাজ শেষ হলেও দীঘিতে কোনো পানি উঠছিল না। পরবর্তী সময়ে রানী স্বপ্নে আদেশ পান খালি পায়ে দীঘির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে যাওয়ার। প্রজা হিতৈষী কমলা রানী পূজা-অর্চনা শেষে দীঘিতে নেমে হাঁটতে শুরু করলে অলৌকিকভাবে নিচ থেকে হুহু করে পানি উঠতে থাকে। হাঁটুপানি থেকে পানি যখন কোমর ছুঁইছুঁই, তখন রানীর আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়েই দীঘিটি কানায় কানায় পানিতে ভরে ওঠে।
বর্তমানে নদীভাঙন ও কালের বিবর্তনে দীঘিটি তার মূল অবয়ব হারালেও স্থানীয়দের কাছে এটি এখনও দক্ষিণ অঞ্চলের এক অনন্য ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী ‘কমলা রানী দীঘি’ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলুপ্তির পথে বসেছে। এ ছাড়া দীঘির চারপাশের পাড় দখল করে গড়ে উঠছে স্থাপনা। এতে দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে এর আয়তন। বহু প্রাচীন লোকগাথা ও ইতিহাসের সাক্ষী এই জলাশয়টি দখল, দূষণ এবং সঠিক তদারকির অভাবে তার পুরোনো রূপ ও সৌন্দর্য হারাতে বসেছে।
কালাইয়ার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, ঐতিহাসিক চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের স্মৃতিবিজড়িত প্রায় ১০০ একর বা ৬১ কানি আয়তনের এই বিশাল দীঘিটি প্রমত্তা তেঁতুলিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে অনেকাংশে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অতীতে এ দীঘির পাড় প্রায় ৪০-৫০ ফুট উঁচু ছিল। তবে দীর্ঘকাল ধরে প্রশাসনিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার না থাকায় এবং নদীভাঙনের কারণে এখন আর আগের সেই বিশাল রূপ বা বিশাল উঁচু পাড়ের সিংহভাগই অবশিষ্ট নেই।
দীঘির যে সামান্য অবশিষ্টাংশ টিকে আছে, তাও কালের পরিক্রমায় পলি ভরাট হয়ে সাধারণ নিচু জমিতে রূপ নিয়েছে। এলাকার স্থানীয় মানুষজনের বেশ কিছু অংশ কৃষিজমি এবং বসতভিটা হিসেবে ব্যবহার করছে। দীঘি থেকে তেঁতুলিয়া নদীর দিকে বয়ে যাওয়া প্রাচীন খালটির কিছু চিহ্ন ও কমলা রানী সম্পর্কিত স্থানীয় লোকগাথা ছাড়া দীঘি হিসেবে এর দৃশ্যমান অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে।
একসময় এই কমলা দীঘিকে ঘিরে দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের মাঝে ছিল বিশাল কৌতূহল ও উন্মাদনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসতেন এই ইতিহাসঘেরা স্থানটি দেখতে। কিন্তু এখন আর কেউ দেখতে আসেন না। এই কমলা সুন্দরী দীঘিটি বর্তমানে মূলত মানচিত্র ও স্থানীয়দের রূপকথার ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
দীঘিটি দ্রুত সংস্কার, পাড় বাঁধাই এবং এর চারপাশে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন কালাইয়া ইউনিয়নবাসী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে