বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের (জিপিএফ) ফান্ডের প্রায় ১০ কোটি টাকা জালিয়াতির নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি ধরা পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে এই কার্যালয়ে কর্মরত থেকে নিজস্ব ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে এই সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। সরকারি টাকা লোপাটের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় ৪ জন সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং ২ সাবেক অডিটরসহ মোট ৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল কার্যালয় এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপন ও অফিস আদেশের মাধ্যমে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী এই ৬ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অভিযুক্ত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মোট ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা সরকারি তহবিল থেকে জালিয়াতি করা হয়েছে।
জালিয়াতির মূল হোতা ৪ সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হলেন- মীর এনামুল হক (সাবেক উপজেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা)। তিনি অনলাইন সিস্টেমে নিজ ইউজার পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ৫২টি জিপিএফ ফান্ডের অগ্রিম বিলের বিপরীতে জালিয়াতি করে একাই হাতিয়ে নিয়েছেন সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে তিনি রামপাল উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
সৌমেন সরকার (সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা)। তিনি একই কায়দায় ৩ টি জিপিএফ অগ্রিম বিলের মাধ্যমে ১৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা জালিয়াতি করেছেন। বর্তমানে তিনি খুলনার তেরখাদা উপজেলায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
মদন কুমার দাস (সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা)। তিনি ৫টি জিপিএফ অগ্রিম বিলের বিপরীতে ১২ লাখ ৮৫ টাকা জালিয়াতি করেছেন। বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের ডিএফএও অফিসের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার হিসেবে কর্মরত।
হাসানুজ্জামান (সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা)। তিনি ২টি জিপিএফ ফান্ডের অগ্রিম বিলের বিপরীতে ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা জালিয়াতি করেছেন। তিনি বর্তমানে খুলনা বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস কার্যালয়ে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে কর্মরত।
লুটের সহযোগী ২ অডিটর হলেন- শ্যামল কুমার দাস। তিনি ২০২২-২০২৩ হতে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে মোট ৬৫টি ভুয়া বিল তৈরি করে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৯৬ হাজার ৬০০ টাকা জালিয়াতি করেছেন। বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের মোংলায় কর্মরত।
আরেকজন হলেন রুবেল মোল্লা। তিনি ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে ১২টি ভুয়া বিলের মাধ্যমে ২৩ লাখ ২১ হাজার ২০০ টাকা জিপিএফ জালিয়াতি করেন। বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের শরণখোলা কর্মরত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের জিপিএফ হিসাবের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস, খুলনা কার্যালয় থেকে গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই সুসংগঠিত চক্রের ভয়াবহ অর্থ লোপাটের চিত্র উঠে আসে।
আদেশে বলা হয়েছে, বরখাস্ত থাকাকালীন সময়ে তারা প্রচলিত বিধি মোতাবেক খোরাকি ভাতা পাবেন। তবে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তারা কেউই স্টেশন ত্যাগ করতে পারবেন না এবং তদন্তের প্রয়োজনে যেকোনো সময় উপস্থিত হতে বাধ্য থাকবেন। জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জের কয়েকজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জিপিএফ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে তাদের হিসাবের সঙ্গে গরমিল দেখতে পান। বিষয়টি নজরে এলে মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা তন্ময় গোস্বামী জিপিএফ হিসাবের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য খুলনার ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস কার্যালয়ে চিঠি দেন। এর প্রেক্ষিতে যাচাই কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির তদন্তেই অনিয়ম দুর্নীতির এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি ঘটনা উঠে আসে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, জিপিএফের অর্থ নিয়ে এ ধরনের লেনদেনের বিষয়ে তারা আগে কিছুই জানতেন না। ঋণ উত্তোলনের সময় হিসাব যাচাই করতে গিয়ে তারা গরমিল দেখতে পান। কোনো কোনো শিক্ষকের হিসাবে একই দিনে বড় অঙ্কের টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে তারা জানান।
এ ব্যাপারে মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিসার তন্ময় গোস্মামী বলেন, তিনি ওই অফিসে যোগদান করার পরে এ ঘটনা ধরা পড়েছে। এত বড় অংকের টাকা আত্মসাৎ হওয়ায় অবাক হয়েছেন। এ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ায় তিনি নিজের জীবন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে খুলনা ডিডিসিএ তামান্না ইসলামের বক্তব্য জানার জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করে কেটে দেন।
সময়ের আলো/মহু