পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই শিবিরের মধ্যে চলমান বিরোধের জেরে দলটির নাম ও নির্বাচনী প্রতীক সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। ফলে আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পক্ষ কিংবা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পক্ষ— কেউই ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম বা ‘ঘাসফুল’ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) কমিশন এ বিষয়ে একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি করে। নির্দেশে বলা হয়েছে, দলটির প্রকৃত সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ কোন পক্ষের হাতে রয়েছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তৃণমূলের নাম ও প্রতীক ব্যবহার স্থগিত থাকবে। একই সঙ্গে দুই পক্ষের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসন্ন উপনির্বাচনে দুই পক্ষকে পৃথক নাম ও প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। তারা নিজেদের পছন্দের নাম বেছে নিতে পারবে এবং কমিশনের নির্ধারিত মুক্ত প্রতীকের তালিকা থেকে আলাদা প্রতীক নির্বাচন করতে হবে।
তৃণমূলের নাম ও প্রতীকের মালিকানা নিয়ে বিরোধটি কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশনের বিবেচনায় ছিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পক্ষ নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত প্রতিনিধি দাবি করে দলটির সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, নাম ও প্রতীকের ওপর অধিকার চেয়ে কমিশনের কাছে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে কমিশন উভয় পক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় নথি ও বক্তব্য চায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির অবশ্য এই দাবি নাকচ করে জানায়, দলের সাংগঠনিক কমিটিগুলোর মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত রয়েছে এবং বর্তমান নেতৃত্বই বৈধভাবে দল পরিচালনা করছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে কালীঘাটের কয়েকজন শীর্ষ নেতা বৈঠকে অংশ নেন। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষের প্রতিনিধিরাও কমিশনের কাছে তাদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি উপস্থাপন করেন।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচনের তারিখ এগিয়ে আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুই পক্ষই এরই মধ্যে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছিল এবং দলীয় নাম ও প্রতীক ব্যবহারের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল।
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে আলাদা হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে দলটির নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ‘ফুল ও ঘাস’, যা পশ্চিমবঙ্গে ‘জোড়া ঘাসফুল’ নামেও পরিচিত। নির্বাচন কমিশনের নথিতে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’-এর সংরক্ষিত প্রতীক হিসেবে ‘Flowers & Grass’ উল্লেখ রয়েছে।
নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধের শুরু থেকেই উভয় পক্ষই এর ওপর নিজেদের অধিকার দাবি করে আসছিল। মমতা-শিবিরের বক্তব্য ছিল, কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তারাই প্রতীক ব্যবহারের অধিকার রাখে। বিপরীতে ঋতব্রত-শিবির নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করে নাম ও প্রতীকের অধিকার চেয়েছে।
তবে কমিশনের বৃহস্পতিবারের অন্তর্বর্তী নির্দেশের ফলে আপাতত কোনো পক্ষই তৃণমূলের নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত দুই শিবিরকেই নতুন নাম ও প্রতীক নিয়ে উপনির্বাচনে অংশ নিতে হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন মূল নজর থাকবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে, দলটির সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষের হাতে যায় এবং নাম ও প্রতীকের অধিকার কে পায়।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ