বাইরে থেকে দেখে প্রথম দর্শনে যে কারও মনে হতে পারে কোনো ছিমছাম নার্সারি বা কিন্ডারগার্টেন স্কুল। দেয়ালে দেয়ালে রঙিন গ্রাফিতি আর ছোট ছোট ভবন। কিন্তু এই কাঠামোর ভেতরেই চলছে মানবসেবার মূল কারিগর তৈরির অন্যতম এক কর্মযজ্ঞ। এটি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়— এটি নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ।
২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা ভবিষ্যৎ চিকিৎসক গড়ার এই বিদ্যাপীঠটি পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ আটটি বছর। তবে আফসোসের বিষয়, প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও নিজস্ব কোনো স্থায়ী ক্যাম্পাসের মুখ দেখেনি প্রতিষ্ঠানটি। চরম আবাসন সংকট, ল্যাবরেটরির শূন্যতা আর ক্লিনিক্যাল সরঞ্জামের তীব্র অপ্রতুলতার মাঝেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এর প্রতিদিনের শিক্ষাকার্যক্রম। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও থেমে নেই শিক্ষার্থীদের পথচলা। ইতিমধ্যেই কলেজের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এমবিবিএস পাস করে যুক্ত হয়েছেন চিকিৎসাসেবায়। দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপের শেষ ধাপে রয়েছেন এবং সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে তৃতীয় ব্যাচের ফল। বর্তমানে এখানে অধ্যয়নরত আছেন ৩৩৩ জন শিক্ষার্থী।
হতাশা প্রকাশ করে একাধিক শিক্ষার্থী জানান, একটি মেডিকেল কলেজ পরিচালনার জন্য ন্যূনতম যে অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, আট বছরেও তা নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। পর্যাপ্ত ল্যাব ও ব্যবহারিক শিক্ষা ছাড়া চিকিৎসক হয়ে বের হলে ভবিষ্যতে পেশাগত দক্ষতা ও জনমনে চিকিৎসকদের প্রতি থাকা অগাধ বিশ্বাস ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
বর্তমানে নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের কয়েকটি আবাসিক ভবনকে জোড়াতালি দিয়ে অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা চিকিৎসা শিক্ষার মতো সংবেদনশীল পরিবেশের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
অবকাঠামোর পাশাপাশি তীব্র শিক্ষক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ৩৩৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১০৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ৫৩ জন শিক্ষক। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক শিক্ষক পদ ফাঁকা রেখে চলছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পাঠদান।
২০১৯ সালে জেলা সদরের মৌজেবালি এলাকায় ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়। জরিপ ও নকশা শেষে গণপূর্ত অধিদফতর ‘উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব’ (ডিপিপি) স্বাস্থ্য অধিদফতরে পাঠালেও অজ্ঞাত কারণে ফাইলটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তী সময়ে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত ৫০০ একর জমি থেকে ৫০ একর জায়গা মেডিকেল কলেজকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভূখণ্ডের নামজারি ও গেজেট প্রস্তাব ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই জমি দিতে আপত্তি জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি আবারও গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে।
জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা থেকে ৫০ একর বরাদ্দ দেওয়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়া হয়। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করলে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হবে এবং ফসলি জমি নষ্ট হবে। তাই পূর্বনির্ধারিত স্থানেই স্থায়ী ক্যাম্পাস করা যৌক্তিক। তাদের মতে— এই সমস্যাটি মূলত অর্থ বা সরকারের সদিচ্ছার নয়, মূল বাধা স্থানীয় দ্বন্দ্ব। প্রভাবশালী মহল নিজেদের এলাকার জমির দাম বাড়াতে ক্যাম্পাস নিজেদের দিকে নিতে চায়। এই টানাটানিতে আটকে আছে পুরো প্রকল্প।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল হক বলেন, জায়গার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় মেডিকেলের স্থান নির্ধারণ করা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আপত্তির কারণেই মূলত কাজটিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে দ্রুত একটি যুগোপযোগী ও কার্যকরী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আলোচনা চলছে।
নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মোহাম্মদ সাইফুল হাসান বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় এমপিসহ ঊর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি শিগগির জমিসংক্রান্ত এই জটিলতার নিরসন হবে।
সময়ের আলো/আতা