‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে কিছু হবে না... রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল, তাই ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে চলতি মাসেই তার দেশে আসা উচিত...’ রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল ইসলামের এ রকম একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রত্যাহার করা হয়েছে তাকে।
শুধু এক রাকিবুলই নন, পুলিশের ভেতর এ রকম ‘ইনসাইডার থ্রেট’ বা বাহিনীর ভেতরে থাকা সাবেক সরকারের নীরব সমর্থকদের ভূমিকা ভাবিয়ে তুলছে সরকার ও পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের। তাই গোয়েন্দা কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পলাতক আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিল ও তৎপরতা বৃদ্ধির ঘটনায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ একটি বড় অংশ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘ইনসাইডার থ্রেট’ বা বাহিনীর ভেতরে থাকা সাবেক সরকারের নীরব সমর্থকদের ভূমিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সাম্প্রতিক গুলশানের মতো স্পর্শকাতর এলাকাসহ দেশের তিনটি জেলার ৬টি স্থানে প্রকাশ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শো ডাউন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা নতুন চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গুলশানের মতো স্পর্শকাতর কূটনৈতিক এলাকায় আগাম কোনো তথ্য ছাড়া শতাধিক নেতাকর্মী জড়ো হওয়া এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা পুলিশের পেশাদারিত্ব ও গোয়েন্দা নজরদারিকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সর্বশেষ ক্যান্টমেন্ট থানার ওসির ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড সেই উদ্বেগের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
সূত্র জানায়, গুলশানের মিছিলের ঘটনাটি নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এটি কি শুধুই গোয়েন্দা ব্যর্থতা, নাকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অবহেলা তা নিয়েও চলছে নানামুখী আলোচনা। মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দারা ইচ্ছা করেই এ রকম তথ্য সংগ্রহ করেনি, নাকি তথ্য থাকার পরও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেনি— তা নিয়েও পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে চলছে বিশদ আলোচনা।
গুলশানের ঘটনার পর পুলিশের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর। একই সঙ্গে বাহিনীটির ভেতরে সাবেক সরকারের নীরব সমর্থকদের বিষয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা।
পুলিশের ডিসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, বিগত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণ হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থা (এসবি, এনএসআই) এবং ডিএমপির ডিবিসহ মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ পদে বড় রদবদল হলেও, মাঠপর্যায়ের ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) এবং কনস্টেবল পর্যায়ের একটি বিশাল অংশ এখনও আগের আমলেরই রয়ে গেছে। পুলিশের একটি অংশের ধারণা, এই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একাংশ এখনও সাবেক সরকারের প্রতি অনুগত বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল, যার ফলে তারা সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না।
ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের ভেতরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও নিষ্ক্রিয়তা কাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেকোনো সময় আবার আমূল বদলে যেতে পারে। এই আশঙ্কায় মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা নিষিদ্ধ সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ বা অ্যাকশন নিতে গিয়ে ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করছেন, যাতে ভবিষ্যতে তারা ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রতিহিংসার শিকার না হন। এই ‘নীরব নিষ্ক্রিয়তা’ কার্যত অপরাধীদের রাজপথে নামার সুযোগ করে দিচ্ছে।
সূত্র জানায়, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য তথ্য পাচার কিংবা সাবেক দলের নেতাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স টিম কাজ শুরু করেছে। সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করে তাদের নন-অপারেশনাল বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলছে। গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পদে শিগগিরই রদবদল হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা।
জানা যায়, সম্প্রতি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকাতে সব গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। নির্দেশ দেওয়া হয় প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশি কার্যক্রম জোরদারের। এ ছাড়া ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি এবং আবাসিক হোটেলে বোর্ডারদের তথ্য সংগ্রহেও জোর দেওয়া হয়।
বর্তমানে ডিবি, সিটিটিসি (কাউন্টার টেররিজম) এবং থানা পুলিশকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো গোয়েন্দা শূন্যতা না থাকে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ জানায়, রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার। অপরাধীরা যাতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় এসে অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে, সে জন্য আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি সন্দেহভাজনদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরেও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিক কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এসব সিদ্ধান্তের পর রাজধানীসহ সারা দেশে বৃদ্ধি করা হয়েছে পুলিশের চেকপোস্টের সংখ্যা। রাজধানীতে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটের চেকপোস্ট সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, মেট্রোপলিটন ও জেলা পর্যায়ে মোট ১ হাজার ৬৩৭টি চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। আর রাজধানীর ঢাকা মহানগরীতে পরিচালনা করা হচ্ছে ২১৫টি চেকপোস্ট।
সম্প্রতি রাজধানীর সব থানার ওসি ও ৮টি বিভাগের ডিসিসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ অপরাধ প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে সিটিটিসি, ডিবি ও থানা পুলিশকে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে ডিউটি করতে হবে, যাতে কোনো এলাকায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শূন্যতা সৃষ্টি না হয় এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি না থাকে। এ ছাড়া কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ মিছির করলে সেখানকার ওসি-ডিসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও