একসময় বাংলাদেশের টেস্ট দলে একজন পেসার থাকাটাই ছিল বড় ঘটনা। নতুন বল হাতে শুরুতে দু-চার ওভার, এরপর স্পিনারদের হাতে তুলে দেওয়া হতো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ। সেই বাংলাদেশ এখন ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী কাউন্টি ক্রিকেটে একের পর এক পেসার দিয়ে চমকে দিচ্ছে। আরও বিস্ময়কর, শুধু সুযোগ পাওয়াই নয়, সুযোগটাকে দুই হাতে লুফে নিয়ে নিয়মিত উইকেটের উৎসব করছেন তারা। হাসান মাহমুদ ও খালেদ আহমেদের কাউন্টি পারফরম্যান্স তাই নিছক ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের বদলে যাওয়ার গল্পও।
কাউন্টি ক্রিকেটের মাহাত্ম্য বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হয়। একসময় কাউন্টিতে খেলার সুযোগ পাওয়াটাই ছিল একজন ক্রিকেটারের জন্য বড় স্বীকৃতি। বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বিস্তার ঘটলেও চার দিনের ক্রিকেটের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতার গুরুত্ব এতটুকুও কমেনি। বরং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কঠিন পরিবেশে নিয়মিত পারফর্ম করতে পারা এখনও একজন ক্রিকেটারের সামর্থ্যরে বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্যও কাউন্টি নতুন কিছু নয়। সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল আগে সেখানে খেলেছেন। তবে তামিম প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাদের কেউই ছিলেন না পেসার।
এবার সেই জায়গাটাই যেন বদলে দিচ্ছেন হাসান মাহমুদ ও খালেদ আহমেদ। চলতি মৌসুমে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে হাসান চার ম্যাচেই নিয়েছেন ২৬ উইকেট। জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য হিসেবে তার এমন পারফরম্যান্স খুব বেশি বিস্ময়কর নয়। টেস্টে পাওয়া তার তিনটি ফাইফারই দেশের বাইরে।
প্রতিপক্ষও ছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের মতো দল। অর্থাৎ বিদেশের কন্ডিশনে নিজেকে কার্যকর প্রমাণ করার সামর্থ্য হাসানের আগেই দেখা গেছে। হাসান-খালেদকে নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সাবেক এক টাইগার অধিনায়ক। তিনি বলেছেন, ‘একটা সময় বাংলাদেশ দল ছিল পুরোপুরি স্পিননির্ভর। তবে ২০১৫ সাল থেকে সেটি বদলে যেতে শুরু করে। যার সুফল পাওয়া যাচ্ছে এই সময়ে এসে।’
কিন্তু হাসান যেভাবে কাউন্টিতে দাপট দেখাচ্ছেন, সেটিও প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। চার ম্যাচে ২৬ উইকেটের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আরও ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলে তিনি কোথায় গিয়ে থামতেন? সেখানেই চলে আসে কাউন্টির দুই কিংবদন্তি ম্যালকম মার্শাল ও ওয়াকার ইউনুসের প্রসঙ্গ।
১৯৭০ সালের পর কাউন্টির এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার রেকর্ড ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ম্যালকম মার্শালের। ১৯৮২ সালে হ্যাম্পশায়ারের হয়ে ২২ ম্যাচে তিনি নিয়েছিলেন ১৩৪ উইকেট। তবে এক মৌসুমের বোলিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিতদের একজন পাকিস্তানের ওয়াকার ইউনুস।
১৯৯১ সালে সারের হয়ে মাত্র ১৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তার শিকার ছিল ১১৩ উইকেট। তার বোলিংয়ের ভয়াবহতা নিয়ে তখন এমন কথাও ছড়িয়ে পড়েছিল, সারের মায়েরা নাকি সন্তানদের ঘুম পাড়াতে বলতেন, ‘ওয়াকার কিন্তু বল করতে আসছে!’
তাই হাসানের চার ম্যাচের ২৬ উইকেট দেখে ক্রিকেট প্রেমীদের মনে আফসোস জাগাটাই স্বাভাবিক, আরও বেশি ম্যাচ পেলে তিনি কতদূর যেতে পারতেন! তবে এবারের কাউন্টি মৌসুমে সবচেয়ে বড় চমক সম্ভবত খালেদ আহমেদ। জাতীয় দলের স্কোয়াডেই যিনি নিয়মিত নন, সেই ৩৩ বছর বয়সি পেসার প্রথম ম্যাচে নিয়েছেন তিন উইকেট।
দ্বিতীয় ম্যাচেই করেছেন আরও বড় বাজিমাত, একটি ফাইফারসহ শিকার করেছেন আট উইকেট। দুই ম্যাচে তার উইকেট সংখ্যা ১১। এখানেই গল্পটা শুধু পরিসংখ্যানের থাকে না। প্রশ্ন ওঠে, তা হলে কি বাংলাদেশের পেসারদের সামর্থ্য এতদিন ঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
কাউন্টির পরিবেশের দিকে তাকালে কিছু উত্তর পাওয়া যায়। উইকেটে ঘাস, সঙ্গে বাতাস। এই দুই উপাদানকে কাজে লাগিয়ে হাসান ও খালেদ ব্যাটারদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছেন। তবে কন্ডিশন শুধু সুযোগ তৈরি করেছে, সেই সুযোগকে সাফল্যে রূপ দিয়েছেন বাংলাদেশের দুই পেসারই।
লাইন-লেন্থ, সুইং, গতি এবং ধারাবাহিকতা দিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন, উপযোগী পরিবেশ পেলে বাংলাদেশের পেসাররাও দীর্ঘ স্পেলে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন।
আর এখানেই দেশের ক্রিকেটের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ও টেস্টে ধীরগতির, নিচু বাউন্সের উইকেট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে পেসারদের জন্য সহায়ক পরিবেশ খুব বেশি দেখা যায়নি। কাউন্টির ঘাস ও বাতাস যদি হাসান-খালেদের সামর্থ্যকে এভাবে সামনে নিয়ে আসতে পারে, তা হলে দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও উইকেট ও কন্ডিশন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ আছে।
বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে এই পরিবর্তনের পেছনে অবশ্য একদিনের গল্প নেই। ব্যাটসম্যান মুমিনুল হক টেস্ট অধিনায়ক হওয়ার পর নিয়মিত তিন পেসার নিয়ে খেলার কৌশল অনুসরণ করেছিলেন। ঘরোয়া ক্রিকেটেও নিজের দলে একই কৌশল প্রয়োগ করেছেন এবং অন্য দলগুলোর ম্যানেজমেন্ট ও অধিনায়কদেরও পেসার ব্যবহারে উৎসাহিত করেছেন। সাবেক বোলিং কোচ ওটিস গিবসন ও অ্যালেন ডোনাল্ডও এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
সেই ধারাবাহিকতারই যেন নতুন প্রমাণ কেন্টে হাসান ও খালেদের দাপট। একজন জাতীয় দলের নিয়মিত পারফরমার, অন্যজন জাতীয় দলের বাইরে-ভেতরে থাকা অভিজ্ঞ পেসার। অথচ ইংল্যান্ডের মাটিতে দুজনই একই বার্তা দিচ্ছেন, বাংলাদেশের পেস বোলিং এখন আর শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়, এটি বাস্তব শক্তি হয়ে উঠছে।
কাউন্টিতে হাসান-খালেদের এই মৌসুম তাই শুধু তাদের ব্যক্তিগত অর্জনের খাতা সমৃদ্ধ করছে না। বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের যে পরিবর্তন গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে, সেটিকেই যেন বিশ্ব ক্রিকেটের সামনে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে। আর দেশের ভবিষ্যৎ পেসারদের জন্য কেন্টের এই দুই গল্প হয়ে থাকছে বড় এক অনুপ্রেরণা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও