মহাবিশ্বের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি বছর আগের ইতিহাস বহন করে পৃথিবীতে পৌঁছানো অত্যন্ত দুর্বল হাইড্রোজেনের বেতার সংকেত শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ আফ্রিকার মিরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে পাওয়া এই সংকেত মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামোর ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্টার্ন কেপের গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল প্রায় ৯৬ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণ থেকে মহাজাগতিক ইতিহাসের দুটি ভিন্ন সময়ের নিরপেক্ষ হাইড্রোজেনের বেতার বিকিরণ শনাক্ত করেন। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স-এ’।
নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন স্বাভাবিক অবস্থায় প্রায় ২১ সেন্টিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেতার তরঙ্গ নির্গত করে। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসার সময় এসব তরঙ্গের দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। এই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের বিভিন্ন সময়ে হাইড্রোজেন কোথায় ছিল এবং কীভাবে ছড়িয়ে ছিল, সে সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন।
এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিটি ছায়াপথ আলাদাভাবে শনাক্ত না করেই সেখানে থাকা বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেনের সম্মিলিত সংকেত পরিমাপ করা হয়েছে। এই কৌশলকে বলা হয় ‘হাইড্রোজেন ইনটেনসিটি ম্যাপিং’। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের বিশাল অঞ্চলজুড়ে পদার্থের বণ্টন তুলনামূলক দ্রুত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
দূরবর্তী হাইড্রোজেনের এত দুর্বল সংকেত শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ মহাকাশের উজ্জ্বল বেতার উৎস, মানুষের তৈরি বেতার তরঙ্গের হস্তক্ষেপ এবং টেলিস্কোপের নিজস্ব বিভিন্ন প্রভাবের তুলনায় হাইড্রোজেনের সংকেত অনেক দুর্বল। আগে এ ধরনের সংকেত নিশ্চিত করতে বেতার টেলিস্কোপের তথ্যের সঙ্গে দৃশ্যমান আলোয় পরিচালিত ছায়াপথ জরিপের তথ্যও ব্যবহার করতে হতো। নতুন গবেষণায় শুধু মিরক্যাটের বেতার পর্যবেক্ষণের তথ্য দিয়েই সংকেত শনাক্ত করা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক সৌরভ পলের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই মহাবিশ্বের মানচিত্র তৈরির কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে হাইড্রোজেন ইনটেনসিটি ম্যাপিং নিয়ে গবেষণা চলছে। মিরক্যাটের মাধ্যমে সরাসরি এই দুর্বল সংকেত শনাক্ত হওয়ায় পদ্ধতিটির ব্যবহারিক সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
শনাক্ত করা সংকেতটি মহাকাশের কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষজুড়ে বিস্তৃত একটি অঞ্চলে হাইড্রোজেনের বণ্টনের তথ্য বহন করছে। এই পরিসরকে আমাদের মিল্কিওয়ে থেকে প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের দূরত্বের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
গবেষণার সহলেখক ঝাওটিং চেন বলেন, ‘ছায়াপথের গঠন ও বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ছায়াপথ আলাদাভাবে শনাক্ত করার প্রয়োজন না থাকায় নতুন পদ্ধতিতে বিশাল মহাজাগতিক অঞ্চলের হাইড্রোজেনের সম্মিলিত সংকেত বিশ্লেষণ করে ছায়াপথের বিবর্তন এবং মহাবিশ্বে পদার্থের বণ্টন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।’
গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্যের আরেকটি বিশেষত্ব রয়েছে। তথ্যগুলো ২০১৮ সালে, মিরক্যাটের বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম শুরুর একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল। তখন হাইড্রোজেনের তীব্রতা মানচিত্র তৈরিই পর্যবেক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল না। সেই পুরনো তথ্য বিশ্লেষণ করেই এত দুর্বল সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা মিরক্যাটের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময় ধরে আকাশের আরও বড় এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হলে হাইড্রোজেনের আরও বিস্তারিত মহাজাগতিক মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এসব মানচিত্রের মাধ্যমে ছায়াপথের জন্ম ও বিবর্তন, অদৃশ্য পদার্থের মাধ্যমে মহাবিশ্বের বৃহৎ জালসদৃশ কাঠামো গড়ে ওঠা এবং কয়েকশ কোটি বছরে মহাবিশ্বের পরিবর্তন সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
গবেষকদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতের স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে বা এসকেএ মানমন্দিরে হাইড্রোজেন ইনটেনসিটি ম্যাপিং মহাবিশ্ব গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিতে পরিণত হবে। মিরক্যাট সেই বৃহৎ রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রকল্পের অন্যতম অগ্রবর্তী টেলিস্কোপ।
সময়ের আলো/মহু