মেসে ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে ‘পিটিয়ে হত্যা’

খুলনা ব্যুরো

সারাদেশ

মেসের ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে খুলনায় মো. আজমুল হোসেন (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার

2026-09-19T14:25:06+00:00
2026-09-19T20:48:59+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
মেসে ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে ‘পিটিয়ে হত্যা’
খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:২৫ পিএম  আপডেট: ১৯.০৯.২০২৬ ৮:৪৮ পিএম
খুলনা মেডিকেল কলেজ। ছবি : সংগৃহীত
মেসের ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে খুলনায় মো. আজমুল হোসেন (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে নগরীর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি চারতলা মেসে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আজমুল হোসেন বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিন ও আসমা বেগমের ছেলে।

স্থানীয়রা জানান, ইসলামনগর রোডের ওই চারতলা ভবন পুরোটা ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্র থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। চারতলায় মোট আটটি কক্ষ রয়েছে। ডি-২ কক্ষে থাকেন মেসের ম্যানেজার ও গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মেহেদী।

মেসের ছাত্রদের বরাত দিয়ে স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার রাতে মেহেদীর ভাত খেয়ে ফেলেন আজমুল। এরপর ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেহেদীসহ মেসের কয়েকজন ছাত্র ও বহিরাগতরা তাকে ছাদে নিয়ে মারধর করেছেন। ছাদ থেকে কিছু একটা নিচে পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান আশপাশের বাসিন্দারা। পরে তারা গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন। মেসের ছাত্ররা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুর খবর জানার পর মেসের ছাত্ররা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দ্রুত চলে যান বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, আজমুলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার দুই পা ভাঙা ছিল।

শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, আটটি কক্ষের ৭টিই তালাবদ্ধ। এর মধ্যে ডি-৮ নম্বর কক্ষে থাকতেন আজমুল। ডি-১ নম্বর কক্ষে নক করলে বেরিয়ে আসেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লাবিব বিশ্বাস রাসেল।

তিনি জানান, চুরির অভিযোগে মেহেদীসহ কয়েকজন আজমুলকে ছাদে নিয়ে যান। সেখানে তাকে মারধর করা হয়। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

ছাদে গিয়ে দেখা যায়, একপাশে অনেক মানুষের পায়ের চলাচলে ধুলাবালি ও ছাদের কিছু অংশের আস্তরণ সরে যাওয়ার চিহ্ন রয়েছে।

মেসের বুয়া ফাতেমা বললেন, ‘আজমুলের বিরুদ্ধে এর আগেও টাকা ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ ছিল। তবে শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেসের ছাত্র ও বহিরাগতরা তাকে মারধর করেন। তিনি নিষেধ করলেও তারা শোনেননি।’ পরে তিনি জানতে পারেন, আজমুল মারা গেছেন।

মেসের পেছনের ভবনের এক নারী বাসিন্দা জানান, শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি জোরে একটি শব্দ শুনতে পান। দরজা খুলে বাইরে এসে দেখেন, বাড়ির সামনে গলিতে একটি ছেলে পড়ে আছে। পরে মেসের ছাত্ররা অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

এদিকে আজ শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে নগরীর হরিণটানা থানায় গিয়ে দেখা যায়, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেনের সামনে বসে আছেন আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন। পেছনের বেঞ্চে নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন তার মা চল্লিশোর্ধ্ব আসমা বেগম।

কুতুব উদ্দিন বললেন, ‘আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে আজমুল। এক বছর আগে লেখাপড়ার জন্য বাড়ি থেকে খুলনায় আসে। গত বছর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে বাড়ি যায়। শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় আসে। রাত ৯টার দিকে ফোনে তাদের সঙ্গে আজমুলের শেষ কথা হয়।’

কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘তখন সে বলেছিল, আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাত ১২টার পরে আমার ছেলের মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য একটি ছেলে ফোন দেয়। বলে, আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত ১ লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না। তখন আমি বলি, আমরা গরিব মানুষ, এক লাখ টাকা কোথায় পাব? তখন সে বলে, আপনি কী করেন? আমি তাকে বলি, আমি কৃষিকাজ করি। তখন সেই ছেলে আবার বলে, আপনি দ্রুত চলে আসেন। তখন আমি বলি, আমি ট্রেনে দ্রুত আসছি। সে বলে, আপনি ট্রেনে আসবেন, না বাসে আসবেন, না প্লেনে আসবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। তারপর সকালে এসে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।’

চোখ মুছতে মুছতে সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ও ওসির সামনে কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরেছে, তাই খুব খুশি হয়েছিলাম। যে ছেলে রাত ৯টায় কথা বলল, বলল ভালো আছি, আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। সেই ছেলেকেই অন্য ছাত্ররা পিটিয়ে মেরে ফেলল। আমি কার কাছে বিচার দিব? আমি কারও কাছে বিচার দিব না। আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আমরা বিচার পাব না। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। আল্লাহই বিচার করবে।’

ওসি মো. ইকবাল হোসেন জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। নিহত আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনগতভাবে যা যা করা যায়, আমরা তাই করব।’

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কানাই লাল সরকার জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তেমন কিছু জানে না। তারা আজমুলের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।

এর আগে গত ১৭ আগস্ট শিশু অপহরণকারী সন্দেহে মো. রাজু (২৬) নামে এক যুবককে এবং ৫ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর কুয়েট রোডে চুরির অভিযোগে সাজমীর (২৪) নামে আরেক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে গত দুই মাসে খুলনা নগরীতে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠল।

সময়ের আলো/মহু/আতা

  বিষয়:   খুলনা  চুরি  যুবক  হত্যা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: