যাত্রী সংকটে গোলাপি বাস, প্রতিদিন লোকসান ৬০ হাজার টাকা

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

নারীদের জন্য চালু করা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ‘গোলাপি বাস’ সেবা যাত্রী সংকটে পড়েছে। ঢাকার ১০টি রুটে চলাচলকারী এই

2026-09-20T17:52:15+00:00
2026-09-20T17:52:15+00:00
 
  রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
যাত্রী সংকটে গোলাপি বাস, প্রতিদিন লোকসান ৬০ হাজার টাকা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৫২ পিএম 
বিআরটিসির গোলাপি বাস। সংগৃহীত ছবি
নারীদের জন্য চালু করা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ‘গোলাপি বাস’ সেবা যাত্রী সংকটে পড়েছে। ঢাকার ১০টি রুটে চলাচলকারী এই বাসগুলোতে পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান গুনছে বিআরটিসি।

গত ১৮ আগস্ট নারীদের জন্য পৃথক ও নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নারী চালক ও নারী সহকারী দিয়ে এই সেবা চালু করা হয়। শুরুতে আরও বাস ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও চালুর এক মাস পরও প্রত্যাশিত যাত্রী পাচ্ছে না সেবাটি।

৭৫ আসনের বাসে যাত্রী ১৫ জন

গত বুধবার বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে বিআরটিসির কমলাপুর ডিপো থেকে মিরপুর-১২-এর উদ্দেশে ছেড়ে যায় নারীদের জন্য নির্ধারিত একটি গোলাপি বাস। ৭৫ আসনের বাসটি মতিঝিল, পল্টন, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, আসাদগেট, কল্যাণপুর হয়ে মিরপুর-১২ পৌঁছায় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে। পুরো যাত্রায় বাসটিতে সর্বোচ্চ ১৫ জন যাত্রী ছিলেন।

বিআরটিসির ১০টি রুটেই প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটির হিসাবে, প্রতিটি বাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে।

সীমিত সময়সূচিই বড় সমস্যা

যাত্রীদের অভিযোগ, গোলাপি বাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা সীমিত সময়সূচি। প্রতিদিন মাত্র দুটি ট্রিপ, একটি সকালে এবং অন্যটি বিকেলে, চালানো হচ্ছে। নির্ধারিত একটি ট্রিপ মিস করলে পরবর্তী বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক নারী সাধারণ বাস, রিকশা বা অন্য পরিবহন ব্যবহার করেন।

আসাদগেট থেকে বাংলামোটরে অফিসে যাতায়াতকারী আতিকা আক্তার নিয়মিত এই সেবা নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, যানজটের কারণে মিরপুর থেকে আসা বাসটি অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে আসাদগেটে পৌঁছায় না। কখনো ২০ মিনিট পর্যন্ত দেরি হয়।

তার মতে, বাসের অবস্থান জানার জন্য অ্যাপভিত্তিক লাইভ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হলে যাত্রীদের অপেক্ষার ভোগান্তি কমবে।

অন্যদিকে, মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুরে নিয়মিত যাতায়াতকারী এক নারী জানান, তিনি গোলাপি বাসের কথা শুনেছেন, কিন্তু তাঁর রুটে বাস না চলায় কখনো ব্যবহার করেননি। সময়সূচিও তাঁর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রুট ও সময় বাড়ানোর দাবি

যাত্রীদের মতে, সীমিতসংখ্যক রুট এবং অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সময়সূচি এই সেবার বড় বাধা। অনেক নারী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাতায়াত করেন। ফলে শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত বাস অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য উপযোগী হয় না।

তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার শিমু প্রথমবার ফার্মগেট থেকে গোলাপি বাসে ওঠেন। তিনি প্রতিদিন ফার্মগেট থেকে কল্যাণপুর যাতায়াত করলেও আগে এই রুটে গোলাপি বাস চলাচলের বিষয়টি জানতেন না।

মিরপুর-১-এর বিএডিসি উচ্চবিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীও পরীক্ষার পর বাড়ি ফেরার সময় গোলাপি বাসে ওঠে। তারা জানান, এর আগে দুবার রাস্তায় বাসটি দেখলেও এবারই প্রথম এতে যাতায়াত করেছেন। নিয়মিত চলাচল করলে তারা প্রতিদিন এই সেবা ব্যবহার করতে চান।

যাত্রী তাহমিনা তাসরিফ ও মারজিয়া ভূঁইয়া তাবেন্দা গোলাপি বাসের পরিবর্তে ডাবল ডেকার বাসের জায়গায় মিনিবাস চালু এবং আরও বেশি রুটে সেবা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো হলে একটি বাস মিস করলেও পরবর্তী বাসে ওঠার সুযোগ থাকবে এবং এতে আরও নারী এই সেবা ব্যবহারে উৎসাহিত হতে পারেন।


পরিকল্পনার ঘাটতির অভিযোগ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান মনে করেন, যথেষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই নতুন করে নারীদের জন্য এই বাসসেবা চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগের নারী-নির্ভর বাসসেবাগুলো কেন ব্যর্থ হয়ে বন্ধ হয়েছিল, তা বিবেচনায় নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা ও সমীক্ষা করা উচিত ছিল।
এটি চতুর্থ উদ্যোগ

ঢাকায় নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর ক্ষেত্রে বিআরটিসির বর্তমান উদ্যোগটি চতুর্থ প্রচেষ্টা।

১৯৯৮ সালে প্রথমবার নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালু করে বিআরটিসি। ২০০১ সালে তা ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সম্প্রসারণ করা হলেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৯ সালে আবার সেবাটি চালু করা হয়। তবে আর্থিক লোকসানের কারণে ২০১৫ সালে সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এরপর ২০১৮ সালে বিআরটিসি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান র‌্যাংগস যৌথভাবে ‘দোলনচাঁপা’ নামে নারীদের জন্য আরেকটি বাসসেবা চালু করে। সেটিও ২০২২ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকায় ১০ রুটে চলছে গোলাপি বাস 

বর্তমানে ঢাকার ১০টি রুটে গোলাপি বাস চলাচল করছে— নতুন বাজার (কোকাকোলা)-মতিঝিল, তালতলা-মতিঝিল, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-জিপিও, মিরপুর-১০-মতিঝিল, মিরপুর-মতিঝিল, মিরপুর-১২-মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল, আবদুল্লাহপুর-মতিঝিল এবং বিমানবন্দর-গাজীপুর।
ঢাকার বাইরে বগুড়ায় শেরপুর-মাটিডালি ও বনানী-মোকামতলা—এই দুটি রুটে এবং চট্টগ্রামে কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটে নারীদের জন্য এই বাসসেবা চালু রয়েছে।
দুই দিনে ১ লাখ ২২ হাজার টাকা লোকসান

গোলাপি বাসসেবা বিআরটিসির আর্থিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে। বিআরটিসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সেবা পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।

২৭ ও ৩০ আগস্ট ১০টি ডিপোর ১৪টি গোলাপি বাস মোট ৩০টি ট্রিপ পরিচালনা করে। ওই দুই দিনে ১ হাজার ৭৯২টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয় ২৭ হাজার ৪২ টাকা। বিপরীতে জ্বালানি, টোল, বেতনসহ পরিচালন ব্যয় ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে দুই দিনে মোট লোকসান হয় ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে লোকসান প্রায় ৬১ হাজার টাকা।

যাত্রী সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও তা এখনো সন্তোষজনক নয়। ১৯ আগস্ট ১২টি বাসে যাত্রী ছিল ৬৬৯ জন। ১৬ সেপ্টেম্বর ১৩টি বাসে যাত্রী বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৫ জনে।

তবে আয় খুব বেশি বাড়েনি। ১৯ আগস্ট আয় হয়েছিল ১০ হাজার ৭৫ টাকা— প্রতি যাত্রীর বিপরীতে গড়ে ১৫ টাকা এবং প্রতি বাসে ৮৩৯ টাকা। ১৬ সেপ্টেম্বর আয় বেড়ে হয় ১৪ হাজার ৯১৪ টাকা। সেদিন প্রতি যাত্রীর বিপরীতে গড় আয় ছিল ১৪ টাকা ৪০ পয়সা এবং প্রতি বাসে ১ হাজার ১৪৭ টাকা।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   গোলাপি বাস  যাত্রী  বিআরটিসি  লোকসান 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: