আইফোন থেকে মোটরসাইকেল, রহস্যজট খুলছে তদন্তে

রুবেল মজুমদার, কুমিল্লা

সারাদেশ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক

2026-09-20T19:43:37+00:00
2026-09-20T20:20:05+00:00
 
  রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড
আইফোন থেকে মোটরসাইকেল, রহস্যজট খুলছে তদন্তে
রুবেল মজুমদার, কুমিল্লা
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৩ পিএম  আপডেট: ২০.০৯.২০২৬ ৮:২০ পিএম
সংগৃহীত ছবি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও মুঠোফোনের কথোপকথনের সূত্র ধরে তিন কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের পরিবারের আগে থেকেই পরিচয় ছিল বলে জানা গেছে।

তুহিন ও ফাহিম উচ্চমাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে অপ্রতিম ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও বিভিন্ন সময়ে অপ্রতিমকে তাদের সঙ্গে চলাফেরা করতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেসেঞ্জারে অপ্রতিমকে সানন্দা এলাকায় ডেকে নেয় তুহিন। তুহিনের মুঠোফোনে অপ্রতিমের সঙ্গে শেষ দিকের কথোপকথনের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। সেখানে তুহিনের অনুরোধে অপ্রতিম প্রায় এক ঘণ্টার জন্য সানন্দায় যেতে সম্মত হয়েছিল।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর অপ্রতিমকে কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রধান ফটকের সামনে দেখা যায়। এরপর সিসিটিভি ফুটেজে তাকে তুহিনের সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দিয়ে সানন্দার দিকে যেতে দেখা যায়।

সানন্দা এলাকার আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে তুহিন ও অপ্রতিমকে ঘটনাস্থলের দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। কিছু সময় পর অন্য একটি পথ দিয়ে আনাস ও ফাহিমকেও ওই এলাকার দিকে যেতে দেখা যায় বলে সূত্র জানিয়েছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এরপরই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়। তবে ঠিক কীভাবে এবং কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে— এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তদন্তে উঠে এসেছে টাকা ও মোটরসাইকেলের একটি সূত্র। এই দ্বন্দ্বের কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা পুলিশের এই সদস্য বলছেন।

নির্ভরযোগ্য একই সূত্রের ধারণা, মোটরসাইকেল কেনা এবং টাকা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি এখনো তদন্তাধীন একটি বিষয়। পুলিশও হত্যার কারণ হিসেবে এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপ্রতিমের সঙ্গে আটক তিন কিশোরের সম্পর্ক, তাদের আর্থিক লেনদেন এবং হত্যার আগে-পরে তাদের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখছেন।

হত্যার পরও তুহিন, আনাস ও ফাহিম স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছিল বলে জানা গেছে। শনিবার সকাল ৮টার দিকে তিনজনই অপ্রতিমের বাসায় যায়। সেখানে কান্নারত তার মা নাহিদা বেগমকে তারা সান্ত্বনা দেন। পরে তুহিন সানন্দায় নিজের বাসায় চলে যায়। আনাস চলে যায় ঢাকার গাবতলী এলাকায়।

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তদন্তে নেমে পুলিশ তাদের গতিবিধি নজরদারিতে আনে। শনিবার দুপুরের দিকে তুহিনকে সানন্দায় তার বাসা থেকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। পরে তার মুঠোফোনে অপ্রতিমের সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথোপকথনের তথ্য পাওয়া যায়। অপ্রতিমকে সানন্দায় ডেকে নেওয়ার বিষয়টিরও প্রমাণ সেখানে পাওয়া গেছে বলে সূত্রের দাবি।

আনাসের অবস্থান সম্পর্কে তুহিনের কাছে জানতে চাইলে সে আনাস মহিপালে নিজের বাড়িতে আছে বলে জানায়। পরে মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্ত করে ঢাকার গাবতলী থেকে আনাসকে আটক করা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। ফাহিমকেও আটক করা হয়। তুহিনকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে নিয়ে আবার সানন্দায় যায়। সেখানে তুহিনের দেখানো স্থান থেকে অপ্রতিমের মায়ের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।


আইফোন উদ্ধারের ঘটনা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, শুক্রবার বিকেলে মায়ের ওই আইফোন নিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। নিখোঁজ হওয়ার পর ফোনটির আর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।

যেভাবে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম
শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। সন্ধ্যার পরও বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

রাতে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর রাতভর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও লালমাই পাহাড়ের আশপাশের এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে থাকে পুলিশ ও স্বজনেরা।

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয় লোকজন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দুই থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর দেন।

খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে যান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। স্বজনেরা মরদেহটি অপ্রতিমের বলে শনাক্ত করেন।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার বিকেলের পর অপ্রতিমকে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে তার পরিবারের সদস্যরা থানায় জানান। পরে তার বাবা সাধারণ ডায়েরি করেন। শনিবার দুপুরে সালমানপুর এলাকায় একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অপ্রতিমের মরদেহ শনাক্ত করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।


সিসিটিভিতে তদন্তের মোড়
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে।

একটি ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। এরপর আরও কয়েকটি ফুটেজে তাদের গতিবিধি শনাক্ত করা হয়।

পরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ওই কিশোরের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা ওই কিশোরের বাড়িতেও যান বলে জানা গেছে। এরপর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়।

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ওই কিশোরকে আটক করে ডিবি পুলিশ। পরে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে আরও দুজনকে আটক করা হয়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় তদন্তের সব তথ্য তখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। প্রকৃত আসামিদের গ্রেফতার করা হলে গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।

অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   আইফোন  মোটরসাইকেল  টাকা  অর্থ সংগ্রহ  অপ্রতিম  খুন  হত্যা  কুমিল্লা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: