কুমিল্লার স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। রোববার দুপুর সোয়া ২টার দিকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এ তথ্য জানিয়েছেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হত্যায় জড়িত থাকার সন্দেহে এর আগেই চারজনকে আটকের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটিও।
শুক্রবার বিকালে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। রাত পর্যন্ত অপ্রতিম বাসায় না ফেরায় তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন।
পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপ্রতিম কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় সিসি ক্যামেরা ভিডিও দেখে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) নামে একজনকে প্রথমে আটক করা হয়। সে কুমিল্লা সিটি কলেজ একাদশ শ্রেণিতে পড়ত। ২০২৫ সালে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর সে ড্রপআউট হয়ে যায়।
তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুই কিশোরকে (১৫) আটক করে পুলিশ। তারা ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ ছাড়া আবদাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সিয়ামকে (১৯) হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার মধ্যরাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন। এতে তুহিন ও দুই কিশোরকে গ্রেফতার দেখানোর কথা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
আসামিরা মাথায় আঘাত করে অপ্রতিমকে হত্যা করে বর্ণনা করে পুলিশ সুপার বলেন, তাদের মধ্যে অসম বন্ধুত্ব ছিল। অর্থাৎ অপ্রতিম ক্লাস সেভেনে পড়ত, কিন্তু যারা তার বন্ধু তারা তার সহপাঠী ছিল না। এরা বয়সে তার চেয়ে বড় ছিল এবং বখাটে ছিল।
তিনি বলেন, আমরা ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করেছি। মূল আসামিকে গ্রেফতার করেছি এবং যে আইফোনটির কারণে হত্যাকাণ্ড, সেই আইফোনটিও আমরা আসামি তুহিনের দেখানো মতে তার বাসা থেকে উদ্ধার করেছি।
রোববার বেলা ১১টার দিকে গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়। এর আগে সকাল ১০টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রথম দফা জানাজা করা হয়েছে।
দাফন শেষে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, দ্রুত বিচার যাতে হয় বর্তমান প্রশাসনের কাছে এটা আমার চাওয়া। আমার ছেলের বয়স মাত্র ১৩ বছর, সে এই বয়সে কোনো ক্রাইম তো করবেই না, না কোনো প্রেমঘটিত কারণ থাকবে। সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে আনন্দে তাদের সঙ্গে যাচ্ছিল সে। আর কোনো বাবাকে যেন তার মতো সন্তান হারাতে না হয় এমন আকুতি জানিয়েছেন কুমিল্লার স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
তিনি বলেন, বাবার কাঁধে সন্তানের মরদেহ কতটা কষ্টের, সেটা আজ বুঝতে পারছি। আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়।
সন্তানহারা এই বাবা বলেন, ‘আমার ছেলের বয়স যখন দুই বছর, তখন সে এই এলাকায় এসেছে। আমার স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অপ্রতিম আপনাদের কাছেই বড় হয়েছে। ‘আপনাদের আদর-স্নেহ পেয়েছে, আপনাদের বাসায় খেয়েছে। তাই আপনাদের কাছেই অপ্রতিমকে সমাহিত করছি।’
এর আগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রথম জানাজায় তিনি বলেন, আমার ছেলে আপনাদের কুমিল্লার আবহাওয়ায়, কুমিল্লার আকাশের নিচে, আপনাদের ভালোবাসায়, আপনাদের স্নেহে বড় হয়েছিল।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওর বয়স ১৩ বছর। আমি ওর বাবা হিসেবে আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। ওর কোনো আচরণে যদি আপনারা ত্রুটি পান, আপনারা ক্ষমা করে দেবেন। এবং ওর জন্য দোয়া করবেন, ও যেন বেহেশতবাসী হয়। আমার একটাই সন্তান। ওর মাতৃভূমি বলেন, এটাই। ও ছোট থেকে এখানেই বড় হয়েছে, আপনাদের ভালোবাসায় বড় হয়েছে।
এদিকে হত্যার প্রতিবাদে ও জড়িতদের বিচার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা। রোববার বেলা পৌনে ১২টার দিকে মহাসড়কের কোটবাড়ী এলাকায় শিক্ষার্থীরা এ অবরোধ করেন। এ সময় মহাসড়কের দুপাশে আটকা পড়ে বিভিন্ন যানবাহন। এ সময় শিক্ষার্থীরা অপ্রতিম হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গড়ে তোলার দাবি করেন।
তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘দড়ি লাগলে দড়ি নে, খুনিদের খবর দে কবর দেব’, ‘শিক্ষকের সন্তান মরে, প্রশাসন কী করে’, আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’ এসব স্লোগান দেয়। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে অবস্থান করছিল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে