অস্ত্র হাতে লড়াইয়ের অঙ্গীকার লাখো ইরানির, নেপথ্যে কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানে ব্যাপক জনসংঘবদ্ধতার নতুন কর্মসূচি নিয়ে চলছে আলোচনা। দেশটির কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাসেবী সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত করতে ‘জানফাদা’

2026-09-21T12:04:17+00:00
2026-09-21T12:06:00+00:00
 
  সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৬ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
‘জানফাদা’ কর্মসূচি
অস্ত্র হাতে লড়াইয়ের অঙ্গীকার লাখো ইরানির, নেপথ্যে কী?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৪ পিএম  আপডেট: ২১.০৯.২০২৬ ১২:০৬ পিএম
তেহরানে রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত 'জানফাদা' কুচকাওয়াজে ইরানি নারীরা। ছবি : সংগৃহীত
ইরানে ব্যাপক জনসংঘবদ্ধতার নতুন কর্মসূচি নিয়ে চলছে আলোচনা। দেশটির কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাসেবী সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত করতে ‘জানফাদা’ নামে একটি বড় কর্মসূচি চালু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এ উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

তেহরানের বিভিন্ন স্থানে টানানো ব্যানারে দেখা যাচ্ছে রকেটচালিত গ্রেনেড, স্নাইপার বা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল এবং যোগাযোগ সরঞ্জামের ছবি। সঙ্গে লেখা—‘আপনি কি এটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয় জানেন?’ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রচারের উদ্দেশ্য হলো সাধারণ স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে প্রস্তুত করা। এর সঙ্গে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অধীন বাসিজ মিলিশিয়ারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

‘জানফাদা’ শব্দের অর্থ জীবন উৎসর্গকারী বা আত্মত্যাগে প্রস্তুত ব্যক্তি। মার্চের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের তীব্রতার সময় কর্মসূচিটি প্রথম সামনে আনে ইরান। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) তেহরানে এর প্রথম প্রকাশ্য সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ হাজারো মানুষ অংশ নেন। অনেককে মুখে মাস্ক ও চোখে কালো চশমা পরে মিছিল করতে দেখা যায়।  

ইরানি কর্তৃপক্ষ আগে এই মিছিলে ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছিল। তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও দেখে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। শিয়া মুসলিমদের দ্বাদশ ইমামপন্থী বিশ্বাসে ৩১৩ সংখ্যাটির বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে; মাহদি নামের গায়েব ইমামের ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সংখ্যা ৩১৩ বলে বিশ্বাস করা হয়। 

তেহরানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান হাসান হাসানজাদেহ জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে ৬ লাখের বেশি মানুষ সক্রিয়ভাবে এই কর্মসূচিতে নিবন্ধন করেছেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, ১০ লাখের বেশি মানুষকে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার ইউনিট বা ‘ব্যাটালিয়ন’ গঠন করা হয়েছে।

তবে কর্মসূচির নিবন্ধন সংখ্যা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। মার্চে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, ৩ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু বিদেশভিত্তিক কয়েকজন কর্মী ওই ওয়েবসাইটের উৎসকোড বিশ্লেষণ করে দাবি করেন, নিবন্ধনের সংখ্যা ৪০ লাখেরও কম। পরে কর্তৃপক্ষ আবার ৩ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধনের দাবি করেছে, তবে এ সংখ্যার পক্ষে কোনো নথি প্রকাশ করা হয়নি।

কর্মসূচিটি শুধু সামরিক উদ্দেশ্যে নয় বলেও জানিয়েছে আয়োজকেরা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনকারীদের প্রায় ২৬ শতাংশ সামরিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রম বেছে নিয়েছেন। বাকিদের জন্য উদ্ধারকাজ, সামাজিক সেবা, গণমাধ্যম ও আর্থিক সহায়তার মতো বিভিন্ন বিভাগ রাখা হয়েছে।

শিশুদেরও যুক্ত করার উদ্যোগ

তেহরানে শুক্রবারের মহড়ায় শিশু ও কিশোরদের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। কয়েকজন কিশোরকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে এবং অন্যদের সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের সড়কে সশস্ত্র কিশোরদের চৌকি ও ব্যারিকেডে দায়িত্ব পালন করতেও দেখা গেছে।

‘জানফাদা’ কর্মসূচির মুখপাত্র সাসান জারে জানিয়েছেন, ১৫ বছরের বেশি বয়সি ছেলেরা নিবন্ধন করতে পারছে। এর পাশাপাশি ১৫ বছরের কম বয়সীদেরও ভবিষ্যতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। 

তার ভাষ্য, শিশু-কিশোরদের মধ্যে আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। ছোটবেলা থেকেই দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের ধারণার সঙ্গে পরিচয় করানো হলে ভবিষ্যতে তাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শুক্রবারের আয়োজনে নারীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। অনেক নারীকে চাদর পরে অস্ত্র হাতে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়। কয়েকজনকে মোটরসাইকেলেও দেখা গেছে, যদিও বেসামরিক জীবনে নারীদের মোটরসাইকেল চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন এই জনসংঘবদ্ধতা?

এই কর্মসূচির পেছনে ইরানের বাইরের ও ভেতরের- দুই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ কাজ করছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও বক্তব্যে উঠে এসেছে।

শুক্রবারের মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ব্যবহৃত ইরানি সামরিক সরঞ্জামও প্রদর্শন করা হয়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞাও বহাল রয়েছে।

ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই সম্প্রতি জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনার সাতটি শর্ত পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ আবার শুরু হলে তার জন্যও প্রস্তুত থাকার কথা বলেছেন তিনি।

তবে শত শত হাজার মানুষকে অস্ত্র হাতে নেওয়া বা নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত করার প্রয়োজন কেন দেখা দিয়েছে, সে বিষয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযান শুরু হওয়ার তাৎক্ষণিক কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও এত বড় জনসংঘবদ্ধতার প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপও বড় কারণ

ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এ কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের প্রভাব, বাজেট সংকট ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশটিতে অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে সরকার জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নির্ধারিত পেট্রোল বরাদ্দও সীমিত করেছে। গ্রীষ্মজুড়ে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা গেছে। শীত মৌসুমে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। 

শুক্রবারের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্বেচ্ছাসেবীদের কম জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করে সরকারকে সহায়তা করার আহ্বান জানান।

বাসিজের ভাবমূর্তি ফেরানোর চেষ্টা?

ইরানের জনসংঘবদ্ধতার এ উদ্যোগকে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত করছেন কিছু বিশ্লেষক।

আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর ইনস্টিটিউটের গবেষক আলী আলফোনেহ আলজাজিরাকে বলেন, ‘জানফাদা’ কর্মসূচিকে বাসিজ মিলিশিয়ার ভাবমূর্তি নতুনভাবে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তার মতে, ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ধর্মীয় ও দেশপ্রেমের তাগিদে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাসিজের মাধ্যমে যুদ্ধে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সংগঠনটি ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও ভিন্নমত দমনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এর জনমত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


আলফোনেহর মতে, নতুন গণসংঘবদ্ধতা বাসিজের আগের দেশপ্রেমিক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ইরানের ওপর বিদেশি চাপ, দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক সংকট থেকে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ দেখা দিলে তা মোকাবিলার প্রস্তুতিও এর পেছনে থাকতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনের পদ্ধতি নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের ইরানবিষয়ক স্বাধীন অনুসন্ধানী মিশন সম্প্রতি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডের মধ্যে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচার আটকসহ এমন কিছু গুরুতর লঙ্ঘন ছিল, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

এদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। সংস্থাটি ৮৭ জন কর্মকর্তাকে তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।

ফলে ‘জানফাদা’ কর্মসূচি শুধু সম্ভাব্য বহিরাগত সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি, নাকি দেশের ভেতরের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেরও একটি উপায়- এ প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ইরান সরকার অবশ্য কর্মসূচিটিকে আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেই তুলে ধরছে। 

সূত্র : আল জাজিরা

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   লড়াই  অঙ্গীকার  ইরান  জানফাদা 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: