আইআইটি বোম্বের শিক্ষার্থী সাহিল ওয়াকুড়ের মৃত্যুর তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চ। একই সময়ে আইআইটি বোম্বে একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপককে ডিনের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং সাহিলের মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে দেওয়া আগের বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছে।
সাহিলের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত জোরদার হওয়ার পর সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ক্যাম্পাসে বিক্ষোভও তীব্র হয়েছে। তদন্তকারীরা সাহিলের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করছেন। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা আইআইটি বোম্বের বাইরে জড়ো হয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার বিরুদ্ধে সাহিলের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মামলা করেছে। এরপর তাকে প্রশাসনিক বিষয়ক ডিনের পদ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
আইআইটি বোম্বের পরিচালক শিরীষ বি. কেদার জানিয়েছেন, তদন্তের ফলাফলের ওপর পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ভর করবে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইআইটি বোম্বের পরিচালক পদত্যাগ করেছেন— এমন খবর ছড়িয়ে পড়লেও প্রতিষ্ঠানটি তা অস্বীকার করেছে। আইআইটি বোম্বে জানিয়েছে, পরিচালক পদত্যাগ করেননি এবং এ-সংক্রান্ত খবরটি মিথ্যা।
সাহিলের মোবাইল ফোন পরীক্ষা
সাহিলের মোবাইল ফোনে কোনো আত্মহত্যার নোট বা তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ক্রাইম ব্রাঞ্চ। পুলিশ জানিয়েছে, সাহিলের হোস্টেল কক্ষে কোনো আত্মহত্যার নোট পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারীরা পাওয়াই ক্যাম্পাসের হোস্টেল নম্বর ৪-এর ঘটনাস্থলও পরীক্ষা করছেন। মামলার এফআইআরে যাদের নাম রয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। তাদের মধ্যে অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লাও রয়েছেন।
সাহিলের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছে। তার অভিযোগ, মৃত্যুর আগে কয়েক মাস ধরে সাহিল জাতিগত বৈষম্য ও মানসিক হয়রানির শিকার হয়েছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে ওই অধ্যাপক সাহিলকে জাতিগতভাবে অপমানজনক কথা বলেছিলেন। তবে এসব অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি। পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করছে।
মামলাটি ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৮ ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এবং তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতির ওপর অত্যাচার প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় করা হয়েছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
আগের বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইল আইআইটি বোম্বে
সাহিলের মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিল, সেটি প্রত্যাহার করেছে আইআইটি বোম্বে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ওই ঘটনার বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করা ঠিক হয়নি বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আইআইটি বোম্বে এক বিবৃতিতে সাহিলের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে তাদের আগের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সাহিলের মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ— দুটিই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনাগুলোকে নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা বা চিহ্নিত করা উচিত হয়নি।
এর আগে, আইআইটি বোম্বে জানিয়েছিল, পরীক্ষার সময় সাহিলকে অনুমতি ছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায় এবং তিনি প্রশ্নপত্র চ্যাটজিপিটিতে দিয়ে উত্তর চেয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শুরু করা হয়নি এবং তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে এই ঘটনা তার পড়াশোনার ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
ক্যাম্পাসের বাইরে বিক্ষোভ
সোমবার আইআইটি বোম্বের বাইরে শিক্ষার্থী ও একটি ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভ করেন। এ সময় মুম্বাই পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে।
বিক্ষোভকারীরা আইআইটি বোম্বের পরিচালক শিরীষ বি. কেদারের পদত্যাগ এবং অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার গ্রেফতারের দাবি জানান।
রোববার রাতে আইআইটি বোম্বে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৈঠকের পর এই বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়। ওই বৈঠকে শিক্ষার্থীরা ১৮টি দাবি তুলে ধরেছিল।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন একাডেমিক কমিটিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব, ক্যাম্পাসে চারটি আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত এবং অধ্যাপকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন।
অধ্যাপকের পাশে ফ্যাকাল্টি ফোরাম
অন্যদিকে আইআইটি বোম্বে ফ্যাকাল্টি ফোরাম অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার পাশে দাঁড়িয়েছে। ফোরামের দাবি, পরীক্ষার সময় তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত একাডেমিক নিয়ম অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ফোরামের বক্তব্য অনুযায়ী, দুল্লা ওই মিড-সেমিস্টার পরীক্ষার শিক্ষক ও পরিদর্শক ছিলেন। পরীক্ষার সময় তিনি সাহিলকে অনুমতি ছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহার করতে দেখেন এবং প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান।
ফ্যাকাল্টি ফোরাম এক বিবৃতিতে অধ্যাপক দুল্লার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে সাহিলের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে অধ্যাপকের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ