স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ সব ধরনের সুবিধা হারাবে না বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, এতে কিছু ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স, প্রস্তুতি ও সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। বাকি ছয় মাসে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে। এ জন্য একটি রোডম্যাপ ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে।
সোমবার মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল শিফট ইন দ্য পোস্ট-এলডিসি ইরা : স্ট্র্যাটেজিস ফর আইপিআর ইস্যুজ অব কি ইন্ডাস্ট্রিজ’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসএসজিপি, ইআরডি ও ডিসিসিআই যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর কোন কোন সুবিধা থাকবে এবং কোথায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি দরকার। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের করণীয়ও নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিসিসিআই ও এফবিসিসিআইসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সহযোগিতায় রোডম্যাপটি পরিশীলিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরে আমরা কি সব সুবিধা হারাচ্ছি? আসলে সব সুবিধা হারাব না। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি দরকার।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনি দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন ইআরডি সচিব। আন্তর্জাতিক আলোচনায় আইনি দক্ষতার ঘাটতি পূরণে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
এসএমই ও গবেষণায় নজর : এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। ধোলাইখাল, কেরানীগঞ্জ, সাভার, ভৈরবসহ বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বংশপরম্পরায় পণ্য তৈরি করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের সরকারি সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। সামান্য নকশাগত পরিবর্তন ও মানোন্নয়ন করা গেলে এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষণা খাতে বরাদ্দ থাকলেও তা পুরোপুরি ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থ থাকলেও বিভিন্ন সংস্থার সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই, তবে কোথাও কোথাও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি পূরণে কাজ চলছে।
এসএমই খাতে অর্থায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ স্কিম ঘোষণা করেছে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না, এর যথাযথ ব্যবহার ও টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সমন্বয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ : এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে সমন্বয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন ইআরডি সচিব। সরকার, বেসরকারি খাত, শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, রোডম্যাপ অনুযায়ী প্রতিটি খাত ও বিভাগের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট আলোচনা করা হবে। কোথায় আইন, বিধি বা কার্যক্রমে পরিবর্তন, সংযোজন কিংবা পরিমার্জন প্রয়োজন, তা পর্যালোচনা করা হবে।
সরকারকে টাস্কফোর্স গঠন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোথায় প্রক্রিয়া জটিল, কোথায় অস্বচ্ছতা এবং কোথায় মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন— এসব বিষয় চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি সেবা আরও সহজ করতে ডিজিটালাইজেশনের কাজ চলছে।
বাংলাদেশের নিজস্ব মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। শুধু আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ নয়, বাংলাদেশের এমন মানদণ্ড তৈরি করতে হবে, যা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি পেতে পারে। তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে মানোন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) শিল্প খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
২৪ মাসেই প্রস্তুতি শেষের লক্ষ্য : এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা প্রসঙ্গে শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, তিন বছর সময় খুব বেশি নয়। তাই পুরো সময় অপেক্ষা না করে আগেই প্রস্তুতি শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ২৪ মাসে আমরা যত ধরনের কমপ্লায়েন্স, রেডিনেস ও ইস্যু আছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করে একটি পর্যায়ে যেতে চাই। বাকি ছয় মাসে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও অপারেশন সফল করার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করব।
তবে সব আইন ও নীতি রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো আইন বা নীতি পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন, নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে হবে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের ফ্যাকাল্টি অব ল এবং ডব্লিউআইপিও একাডেমির সাবেক পরামর্শক মোহাম্মদ আতাউল করিম।
সভায় ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও এসএসজিপির প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম জাহাঙ্গীর, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফায়েজ আহমেদ, ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রইসুল কবির, আইপিএবির পরিচালক জেনারেল এমদাদুল আজিজুর রহমান, বিজিএমইএর সেক্রেটারি জেনারেল মেজর জেনারেল ড. মো. শাহেদুল ইসলাম (অব.) এবং বামার সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমানসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন।
সময়ের আলো/কেএইচও