বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মধ্যে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দুটি যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা এবং বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জড়ো হচ্ছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, গভীর অনিশ্চয়তার সময়ে বিশ্বনেতারা জাতিসংঘে সমবেত হচ্ছেন। একই সঙ্গে বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও খাপ খাওয়াতে হবে।
গত নয় মাসে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর ইরানে সরকারপন্থী বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনের পর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটে। এর কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানে যৌথ হামলা চালালে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। পরে সেই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর প্রভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধও থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উভয় পক্ষ হামলা আরও জোরদার করেছে। যুদ্ধ বন্ধে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা বড় কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।
এর পাশাপাশি, মে মাসে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও উগান্ডায় ইবোলার প্রাদুর্ভাব নতুন মহামারির জন্য আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ায় প্রাণঘাতী ভূমিকম্প এবং নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবও সামনে এনেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে এপি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন দেশের বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত ও কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে থাকা সংকটগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
জাতিসংঘে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট উড বলেন, কূটনৈতিকভাবে কিছু সংকট সমাধানের চেষ্টা করার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাঁর মতে, জাতিসংঘ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে।
একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক ও আরেক কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের তুলনায় বিশ্ব পরিস্থিতি ভালো হয়নি; বরং আরও অস্থিতিশীল হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের ওপর বিভিন্ন ধরনের আঘাত, মধ্যস্থতার উদ্যোগের ভেঙে পড়া বা ঘাটতি এবং জলবায়ু, শান্তি ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে বৈশ্বিক ঐকমত্যের অভাব নিয়ে তাঁরা উদ্বেগ জানান।
এবারের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের দিকে বিশেষ নজর থাকবে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা অধিবেশনের ফাঁকে মিত্র ও প্রতিপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের মতো বিষয়গুলোতে অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা করবেন।
স্লোভেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টোনে কাজের বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব ও জোটের ধরন বদলালেও জাতীয় স্বার্থই স্থায়ী থাকে। এসব স্বার্থ কীভাবে সমন্বয় করা যায়, যাতে বিশ্ব স্থায়ী সংঘাতের বদলে শান্তিতে থাকতে পারে— সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/কেএইচ