তাইওয়ানকে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন আবারও আলোচনায় এসেছে। চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেইজিং তাইওয়ান ইস্যুকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে।
তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান কী?
চীনের দাবি, প্রাচীনকাল থেকেই তাইওয়ান চীনের অংশ। ১৮৮৫ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত দ্বীপটি চীনের ছিং সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ ছিল। পরে যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাইওয়ান জাপানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিক অব চায়না সরকারের হাতে যায়। এরপর চীনের গৃহযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে পরাজিত রিপাবলিক অব চায়না সরকার তাইওয়ানে চলে যায়। একই বছর মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় পিপলস রিপাবলিক অব চায়না।
বেইজিং তাইওয়ানকে চীনের একটি প্রদেশ হিসেবে দেখে এবং দ্বীপটির স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হওয়ার অধিকার অস্বীকার করে। একই সঙ্গে তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শক্তি প্রয়োগের পথও পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি চীন। তবে তারা ‘শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণ’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে।
চীনের ভাষায়, তাইওয়ান তাদের ‘মূল স্বার্থের মূল’ এবং এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বিদেশি নেতাদের সঙ্গে তাইওয়ানের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগকেও বেইজিং নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে।
তাইওয়ান নিয়ে মার্কিন কর্মকাণ্ডে চীনের প্রতিক্রিয়া
তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পদক্ষেপের জবাবে চীন একাধিকবার সামরিক মহড়া চালিয়েছে। ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফরের পর দ্বীপটির চারপাশে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালায় চীন। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান-সম্পর্কিত বিভিন্ন তৎপরতার জবাবে একাধিক সামরিক মহড়া হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে তাইওয়ানের আশপাশে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছিল চীন। এর আগে ওই মাসেই ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়, যা সে সময় পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্যাকেজ ছিল।
তাইওয়ানের অবস্থান কী?
তাইওয়ান বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তাইপে নিজেদের ‘রিপাবলিক অব চায়না’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগাযোগ ও নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচনের অধিকার রয়েছে বলে মনে করে।
তাইওয়ানের বক্তব্য, পিপলস রিপাবলিক অব চায়না কখনোই দ্বীপটি শাসন করেনি। তাই দ্বীপটির প্রতিনিধিত্ব বা এর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করার অধিকারও বেইজিংয়ের নেই।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে চীনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে আসছেন। তবে বেইজিং তাঁকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করে এবং ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। দুই পক্ষের কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে অপর পক্ষকে স্বীকৃতি দেয় না।
তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাইপের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। তবে ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’-এর আওতায় তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ান চায়না’ নীতির অধীনে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান নেয় না ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে তাইওয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে দেশটি এবং নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ করে।
তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সম্পর্ক রাখে?
তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কার্যালয় রয়েছে, যার নাম আমেরিকান ইনস্টিটিউট ইন তাইওয়ান। দুই পক্ষের মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও রয়েছে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক মিত্রদের সফরের পথে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ট্রানজিট’ করেন। এসব সফরে তাঁরা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তবে ১৯৭৯ সালে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সরাসরি ফোনালাপ হয়নি। ২০১৬ সালের শেষ দিকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট ফোনে কথা বলেছিলেন। ওই ঘটনায় চীন কূটনৈতিকভাবে আপত্তি জানালেও প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ