একসময় গ্রামবাংলার বড় বাড়ির দরজা কিংবা পুকুরপাড়ের আঙিনায় দেখা মিলত ছোট্ট টিনশেড বা ছনের একটি ঘরের। নাম তার ‘কাচারি ঘর’। ঘরটি ছিল একসঙ্গে পড়াশোনা, অতিথি আপ্যায়ন, সামাজিক বৈঠক ও পারিবারিক নানা কর্মকাণ্ডের জায়গা। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে গ্রামবাংলা, হারিয়ে গেছে সেই কাচারি ঘরও। এখন নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এটি কেবল গল্পের বিষয়।
নব্বইয়ের দশকের আগেও গ্রামের অধিকাংশ বড় বাড়িতে কাচারি ঘরের প্রচলন ছিল। ভোরে ফজরের নামাজের পর সেখানে বসত মক্তব। শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হতো। সন্ধ্যা নামলে জ্বলে উঠত হারিকেনের আলো। বাবা কিংবা শিক্ষকদের তদারকিতে বই-খাতা নিয়ে পড়তে বসত পরিবারের ছেলেমেয়েরা। শুধু পড়াশোনাই নয়, অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা এবং গ্রাম্য বিচার-আচার ও নানা সামাজিক বিষয় নিয়ে বৈঠকও বসত এসব ঘরে।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের আলহাজ আবদুল মান্নান চেয়ারম্যান বাড়ির দরজায় এখনো একটি কাচারি ঘরের অস্তিত্ব রয়েছে। তবে সেটি বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয় কলেজশিক্ষক আলাউদ্দিন বলেন, আমাদের সময়ে কাচারি ঘর ছিল। সেখানে আমরা পড়াশোনা করতাম। অতিথিরাও এ ঘরে থাকতেন। গ্রাম্য বিচার-আচার নিয়েও বৈঠক বসত। এখনকার প্রজন্ম তো জানেই না কাচারি ঘর কী।
চরফ্যাশন উপজেলার জিন্নাগড় ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদারবাড়ি ও মাওলানা ছিদ্দিক বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় অনেক কাচারি ঘর ছিল। স্থানীয়দের মতে, উপজেলার ২১টি ইউনিয়নে কয়েক শ কাচারি ঘর থাকলেও কালের বিবর্তনে সেগুলোর অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়েছে।
কাচারি ঘরে বসেই যাদের শিক্ষাজীবনের শুরু, তাদের একজন পরিবার উন্নয়ন সংস্থার (এফডিএ) পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, আমাদের বাড়ির দরজায় একটি কাচারি ঘর ছিল। সেখানে আমরা ভাইয়েরা সবাই শিক্ষকের কাছে পড়তাম। মাগরিবের নামাজের পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করতে হতো।
তার মতে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর আজ হারিয়ে গেছে।
চরফ্যাশন সরকারি কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রভাষক নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা চার ভাই বাবার তদারকি ও মায়ের কড়া শাসনে কাচারি ঘরে হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করেছি। বর্তমানে আমি ও আমার অন্য ভাইয়েরা সরকারি চাকরিতে কর্মরত।
মান্নান চেয়ারম্যানের ছেলে ইনাম আহমেদ মাসুমও কাচারি ঘরের স্মৃতি মনে করে বলেন, সন্ধ্যা নামলেই আমরা বই-খাতা নিয়ে কাচারি ঘরে পড়তে বসতাম। বাবা পাশে বসে দেখতেন, আমরা পড়ছি কিনা।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, অতীতে কাচারি ঘর ছিল গ্রামীণ শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এসব ঘর থেকেই অনেক শিক্ষিত ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে এসে ঐতিহ্যটি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে পুরোনো কাচারি ঘরগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব।
একসময় যে ঘরগুলোতে হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা সামাজিক বৈঠক হতো, সময়ের স্রোতে সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। কোথাও পড়ে আছে জরাজীর্ণ কাঠামো, কোথাও শুধু মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে কাচারি ঘর— গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্য।
সময়ের আলো/জোই