কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঢুকতেই ডান পাশের দেয়ালে লেখা—‘আমি ও আমার কার্যালয় দুর্নীতিমুক্ত।’ তবে এই কার্যালয়কে ঘিরে সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন নামে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সেরেস্তা, দলিল লেখক, স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট এসব অর্থ আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি।
অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে অফিস খরচ, মসজিদ উন্নয়ন ও দলিল লেখক সমিতির নামে প্রায় ৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তন দেখিয়ে সাফ-কবলা দলিলের পরিবর্তে হেবা-বিল-এওয়াজ কিংবা দানপত্র দলিল রেজিস্ট্রি করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি ও অনিয়ম বন্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন উলিপুরের সচেতন মহল।
অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে উলিপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৬ হাজার ৪৩টি দলিল সম্পাদন হয়েছে। এসব দলিলের মধ্যে হেবা-বিল-এওয়াজ, আমমোক্তারনামা, দানপত্র ও ঘোষণাপত্র দলিলও রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে স্থানীয় সিন্ডিকেটের ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে চাননি। দলিল লেখকদের মধ্যেও অনেকে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে সমিতির মাধ্যমে হয়রানির আশঙ্কায় তারাও প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দলিল লেখক জানান, প্রতিটি সাফ-কবলা দলিলের জন্য তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং হেবা কিংবা দানপত্র দলিলের জন্য ৬ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। তাদের অভিযোগ, এর মধ্যে ২ হাজার ৯০০ টাকা ‘সেরেস্তা’র নামে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে যায়। বাকি টাকা সমিতির নামে রাখা হলেও দিন শেষে তারা এর সুফল পান না।
তাদের আরও অভিযোগ, সমিতির কোনো লিখিত কার্যকরী কমিটি না থাকলেও মৌখিকভাবে গঠিত কমিটির নিয়ন্ত্রণে তাদের কাজ করতে হয়।
গুনাইগাছ ইউনিয়নের জমিদাতা ইয়াকুব আলী বলেন, জমি দলিল করতে সরকারি ফির বাইরে অফিস খরচের কথা বলে ৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। আমি ৩ হাজার টাকা দিতে চাওয়ায় আমার সঙ্গে অযাচিত আচরণ করা হয়। পরে বাধ্য হয়ে তাদের দাবিকৃত টাকা দিতে হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী বলেন, মঙ্গলবার আমার একটি কাগজের সমস্যা দেখিয়ে ৬ হাজার টাকার বাইরে আরও ১ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না চাইলে পরের সপ্তাহে দলিল সম্পাদনের কথা বলে আমাকে বিদায় করা হয়। কিন্তু পরের সপ্তাহে লোকজন নিয়ে আসতে গেলে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হতো। তাই বাধ্য হয়ে দাবিকৃত ১ হাজার টাকা দিয়ে দলিল সম্পাদন করি।
এদিকে, গত আট মাসে ৬ হাজার ৪৩টি দলিলে মসজিদ উন্নয়নের নামে দলিলপ্রতি ১০০ টাকা করে প্রায় ৬ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ নির্দিষ্ট কয়েকটি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতা দেওয়া ছাড়া কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সেরেস্তার নামে সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে উলিপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার ওয়াহেদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
দলিল লেখক সমিতির নামে প্রায় ২ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেক খান বলেন, সরকারি ফির বাইরে আমাদের পারিশ্রমিক বাবদ দলিলপ্রতি ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে কোনো সেবা গ্রহীতা দিতে অপারগ হলে জোর করে নেওয়া হয় না।
মসজিদ উন্নয়নের অর্থের বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকটি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতা এবং সংস্কারকাজে ওই টাকা ব্যবহার করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার রুহুল কুদ্দুসের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নেই।
সময়ের আলো/জোই