আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিকে ‘দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ আল-খালেদ আল-হামাদ আল-মুবারক আল-সাবাহ। একই সঙ্গে গাজা ও লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন কুয়েতের যুবরাজ।
শেখ সাবাহ বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান কুয়েত, উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্ডানের বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে ‘অবৈধ’ হামলা চালিয়ে আসছে। কুয়েত আঞ্চলিক সংঘাতের কোনো পক্ষ না হলেও দেশটিতে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এসব হামলা আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। হামলায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহকেন্দ্র এবং তেল স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বারবার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, আহত এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কুয়েতের যুবরাজ বলেন, এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য একটি টেকসই আঞ্চলিক সমঝোতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও প্রক্সিদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং অঞ্চলের সব দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগের সমাধান করা জরুরি।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
ইরাকের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বার্তা
বক্তব্যে ইরাককে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন কুয়েতের যুবরাজ। ২০০৩ সালে ইরাকের সাবেক শাসনব্যবস্থার পতনের পর দেশটির পুনর্গঠনে কুয়েতের সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ইরাকে অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদারে প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করেন শেখ সাবাহ। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের পাশাপাশি অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এর মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, খোর আবদুল্লাহ চুক্তি এবং ২০০৮ সালের নিরাপত্তা-বিষয়ক প্রোটোকল বাস্তবায়নের মতো বিষয় রয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি কুয়েতি বন্দী ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে অগ্রগতি, তৃতীয় দেশের নাগরিকদের বিষয় এবং কুয়েতের রাষ্ট্রীয় নথিসহ অন্যান্য সম্পদ ফেরত পেতে জাতিসংঘের সঙ্গে ইরাককে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান
ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কুয়েতের যুবরাজ ইসরায়েলি বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, বাস্তুচ্যুতি, গ্রেফতার ও বসতি স্থাপনের নীতির কারণে ফিলিস্তিনিরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।
তিনি গাজা শান্তি পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। এর মধ্যে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ওই অঞ্চলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ফিরে আসার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন তিনি।
ইয়েমেন প্রসঙ্গে শেখ সাবাহ বলেন, হুতি হামলার কারণে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচল হুমকির মুখে পড়ছে। জাতিসংঘের নেতৃত্বে ইয়েমেন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের প্রতি কুয়েতের সমর্থনের কথা জানান তিনি।
সৌদি আরবের ওপর হুতি হামলারও নিন্দা জানান কুয়েতের যুবরাজ। তিনি বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা কুয়েত ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
সিরিয়া ও লেবানন প্রসঙ্গ
সিরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটিকে সন্ত্রাসবাদে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়কে স্বাগত জানান শেখ সাবাহ। একই সঙ্গে সিরিয়ায় সিরীয়দের নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানান তিনি। তবে সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও অনুপ্রবেশের নিন্দা করেন।
লেবাননের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্ব পুরো দেশে প্রতিষ্ঠা এবং অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কেবল রাষ্ট্রের হাতে রাখার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি অধিকৃত লেবাননি ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের শেষ দিকে কুয়েতের নিজেদের ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন যুবরাজ। তিনি বলেন, দখলদারত্ব ও আগ্রাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং গত চার দশকে যুদ্ধের কারণে কুয়েত বুঝতে পেরেছে, শান্তিই প্রজ্ঞার পথ।
তিনি আরও বলেন, সংলাপ অধিকারকে খর্ব করে না; বরং অধিকার সংরক্ষণ করে। আর নিরাপত্তা শুধু শক্তি দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না; এর ভিত্তি হতে হবে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক বৈধতার নীতি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ