ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে মঞ্চে উঠতেই সভাকক্ষ থেকে বহু দেশের প্রতিনিধি বেরিয়ে যান। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় ৭৭টি দেশের প্রতিনিধিদল হয় সভাকক্ষে অনুপস্থিত ছিল, নয়তো বক্তব্য শুরুর সময় হল ছেড়ে যায়। ওই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এ ঘটনা ঘটে। নেতানিয়াহু মঞ্চে ওঠার পরপরই একের পর এক প্রতিনিধিকে সভাকক্ষ ত্যাগ করতে দেখা যায়। ফলে তাঁর বক্তব্যের সময় সভাকক্ষের অনেক আসন ফাঁকা হয়ে যায়। এ সময় কিছু জায়গা থেকে প্রতিবাদ ও দুয়োধ্বনিও শোনা যায়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমানকে কয়েকবার সভাকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানাতে দেখা যায়।
বাংলাদেশের পাশাপাশি তালিকায় ছিল ফিলিস্তিন, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, লেবানন, ইরাক, জর্ডান, মিসর, ইয়েমেন, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, ব্রাজিল, চিলি, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দেশ।
তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ৭৭ দেশের হিসাবকে সরাসরি ‘সবাই ওয়াকআউট করেছে’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকাশিত তালিকায় এমন দেশও রয়েছে, যাদের প্রতিনিধিরা ওই সময় সভাকক্ষে উপস্থিত ছিলেন না। উদাহরণ হিসেবে জর্ডান ও মিসরের প্রতিনিধিরা আসন গ্রহণ করেননি, কিন্তু তারা আনুষ্ঠানিক ওয়াকআউটে অংশ নেয়নি। আবার পাকিস্তানের প্রতিনিধিদল প্রতিবাদ জানিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরে সভাকক্ষের এক পাশে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্য শোনে।
নেতানিয়াহুর কটাক্ষ
প্রতিনিধিদের বেরিয়ে যাওয়ার পরও বক্তব্য শুরু করেন নেতানিয়াহু। শুরুতেই তিনি ওয়াকআউটকারীদের উদ্দেশে কটাক্ষ করে বলেন, যারা এখনো সভাকক্ষে রয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ যদি ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ হন, তাহলে যেন বেরিয়ে যান।
তিনি আরও দাবি করেন, সভাকক্ষ ত্যাগ করা কয়েকটি দেশের নেতারা ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাঁর ভাষণে ইরান ও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেন তিনি এবং হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।
নেতানিয়াহু বলেন, গাজায় ইসরায়েলের অভিযান এখনো শেষ হয়নি এবং হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার নিয়েও তিনি বক্তব্য দেন।
গাজা যুদ্ধ ঘিরে কূটনৈতিক প্রতিবাদ
নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় এই গণপ্রতিনিধি-প্রস্থান ঘটে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেই। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এর আগেও জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে গাজায় যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের হতাহত এবং মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
এবারের ঘটনাটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাকক্ষে ইসরায়েলকে ঘিরে গভীর কূটনৈতিক মতপার্থক্যের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। একই সঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, কোন দেশ প্রতিবাদ হিসেবে বেরিয়েছে আর কোন দেশের প্রতিনিধি আগে থেকেই অনুপস্থিত ছিলেন— দুটি বিষয় এক নয়।
কোন দেশগুলো ছিল না
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের প্রকাশিত ৭৭ দেশের তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশ ছাড়াও এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ রয়েছে।
তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলোর নাম নেই। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের প্রতিনিধিরা সভাকক্ষে থেকে নেতানিয়াহুর বক্তব্য শোনেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের বাইরে বিক্ষোভ
নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে স্লোগান দেন।
এদিকে জাতিসংঘের সভাকক্ষের ভেতরে প্রতিনিধিদের ব্যাপকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। নেতানিয়াহুর বক্তব্যের আগে ও বক্তব্য চলাকালে খালি হয়ে যাওয়া আসনের ছবিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য এবং গণপ্রতিনিধিদের ওয়াকআউটের ঘটনা গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘে ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান কূটনৈতিক বিভাজনকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ