ফরিদপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা বায়েজিদ হোসেন শাহেদের নকল ওষুধ কারখানার সন্ধান পেয়ে অভিযান চালিয়েছে যৌথবাহিনী। প্রশাসন জানিয়েছেন, অননুমোদিতভাবে ও প্রশিক্ষিত কেমিস্ট ছাড়াই পরিচালিত হয়ে আসছিল কারখানাটি। যেখান থেকে উৎপাদিত অবৈধ আয়ুর্বেদিক ওষুধ, শিশু খাদ্যপণ্য ও যৌন উত্তেজক ওষুধ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতো এবং তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বলে যৌথবাহিনী জানিয়েছেন।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার ১ নং সড়কে অবস্থিত 'জনতা আয়ুর্বেদিক ল্যাবরেটরিজ' নামক কারখানাটি ঘিরে রাখেন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) ফরিদপুর ক্যাম্পের সদস্যরা। পরে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সহযোগিতায় রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার মো. সাকিব রহমান আকাশ এবং এসআরবি-১০ এর ফরিদপুর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর ফারহান।
যৌথবাহিনী সূত্রে জানা যায়, আমেরিকা প্রবাসী আবুল কাশেমের চারতলা ভবনের নিচতলা ভাড়া নিয়ে 'জনতা ল্যাবরেটরিজ আয়ুর্বেদিক' নামে কারখানাটি দীর্ঘদিন যাবৎ পরিচালনা করে আসছিলেন বায়েজিদ হোসেন শাহেদ। যেটি প্রধান শাখা হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। যে কারখানাটি ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহার করে ও অননুমোদিতভাবে পরিচালনা করছিলেন এনসিপি নেতা।
প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে অভিযানকালে একের পর এক বেরিয়ে আসে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ওষুধ। প্রতিটি কক্ষে যন্ত্রপাতি বসিয়ে ক্ষতিকর উপাদান বা কেমিক্যাল দিয়ে যেগুলো তৈরি করা হতো। অভিযানকালে প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের অবৈধ আয়ুর্বেদিক ওষুধ, শিশুদের জন্য বেবি জেল ও শিশু খাদ্য এবং যৌন উত্তেজক ওষুধ ও কাঁচামাল জব্দ করা হয়। এ সময় জিল্লুর রহমান নামে এক কর্মচারীকে আটক করা হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। এছাড়া স্থাপিত যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলার জন্য ভবন মালিককে সাতদিনের সময় দেওয়া হয়। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাকিব রহমান আকাশ বলেন, মঙ্গলবার বায়েজিদ হোসেন শাহেদের মালিকানাধীন জনতা ল্যাবরেটরিজের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। ওই অভিযানে শাহেদকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওই ব্যক্তির প্রধান অবৈধ কারখানাটির সন্ধান পায় এসআরবি। পরে জেলা প্রশাসন অবগত করা হয়। আমরা এখানে বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ওষুধ, শিশু খাদ্যের বিভিন্ন ক্ষতিকর কেমিক্যাল, আয়ুর্বেদিক ওষুধ পেয়েছি। এগুলো আমরা বাজেয়াপ্ত করেছি এবং বিনষ্ট করা হবে। এছাড়া, এখানে দায়িত্বরত কর্মচারীকে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিকার আইনে ভেজাল পণ্য ও ওষুধ সংরক্ষণের দায়ে ২০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এখানে যে ওষুধগুলো তৈরি করা হতো সেগুলো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এবং প্রয়োজনীয় কোনো অনুমোদিত কাগজপত্র নেই৷ এখান থেকেই উৎপাদন ও প্যাকেটজাত করে মূলত ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকতো বলে আমরা বিভিন্ন রশিদও পেয়েছি।
এই রশিদের সূত্র ধরে অন্যান্য জায়গাতেও অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে এসআরবি কর্মকর্তা মেজর ফারহান জানিয়েছেন। এছাড়া জনতা আয়ুর্বেদিক ল্যাবরেটরিজের অন্যান্য শাখা থাকলেও সেগুলো সন্ধান করা হবে বলে তিনি জানান।
এর আগে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট মোল্লা বাড়ি সড়ক এলাকায় অবস্থিত ওই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। এ সময় অবৈধভাবে ওষুধ তৈরি ও সংরক্ষণের দায়ে স্বত্বাধিকারী বায়েজিদ হোসেন শাহেদকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির ফরিদপুর জেলা কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে ছিলেন ও জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা। তাকে কারাদণ্ড দেওয়ার পরে বৃহস্পতিবার বিকেলে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি এক বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় সকল পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের নির্দেশক্রমে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এছাড়া বলা হয়, গুরুতর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ড এবং সংগঠনের নীতি ও আদর্শবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
বহিষ্কারের সত্যতা নিশ্চিত করেন জেলা এনসিপির সদস্য সচিব সাঈফ হাসান খান। তিনি বলেন, বিকেল ৫টার দিকে কেন্দ্রীয় কমিটি একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে আমাদের। এখন থেকে সে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ, এনসিপি স্বচ্ছ রাজনীতিতে বিশ্বাসী, এখানে কোনো অপরাধীর স্থান নেই।
সময়ের আলো/আতা