কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি। পরিদর্শন শেষে তিনি জানিয়েছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত উখিয়ার ২ ডব্লিউ ও ৪ এক্সটেনশন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় তিনি এসব কথা বলেন।
মীর শাহে আলম বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে চীনের সিএমইসি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় প্রতিদিন ৩ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় ৪৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চীনের উইমীম নামে একটি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেও যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠান বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ করবে। এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ফিনল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সরকারের বিশেষ সুযোগের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকার কিনবে। মানুষকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে উৎসাহিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সারা দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় প্রায় ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৫০৩টি উপজেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার ও হাটবাজারসহ মোট ৬ হাজার ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হবে।
মীর শাহে আলম বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ নিজেদের ব্যবহারের জন্য এবং অতিরিক্ত আরও প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৩ লাখ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হবে। অতিরিক্ত অর্থ রাখা হয়েছে, যাতে ইউনিয়ন পরিষদগুলো এ কাজে উৎসাহিত হয়।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আয়ের অর্থ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ হাটবাজার থেকে ৫ শতাংশ এবং ভূমি রেজিস্ট্রেশন থেকে ১ শতাংশ আয় পায়। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনেরও নিজস্ব আয় রয়েছে। এসব আয়ের সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ যুক্ত করে আরও বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া ৩৭০ কোটি টাকার সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা যোগ করতে পারবে। এর মাধ্যমে নিজেদের চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশেষ প্যাকেজের সুবিধা নেওয়ার সময়সীমা সম্পর্কে মীর শাহে আলম বলেন, আগে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ৭ টাকা ৯০ পয়সা। নতুন ঘোষিত প্যাকেজের আওতায় প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়া যাবে। তবে এ সুবিধা নিতে হলে ২০২৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এরপর এ বিশেষ প্যাকেজ আর থাকবে না।
উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র পরিদর্শনের কারণ জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি প্রকল্পটি দেখতে এসেছেন। একটি বৈঠকে প্রকল্পটির বিষয়ে জানানো হলে সরেজমিনে দেখে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পটি দেখে এখন পর্যন্ত তার কাছে কার্যকর ও যুক্তিসংগত মনে হয়েছে। তবে কিছু বিষয় সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সেগুলো পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কক্সবাজার পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ এখনো স্বয়ংক্রিয় নয়, ম্যানুয়ালি করা হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। উখিয়ার প্রকল্পে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হবে। বাকি কিছু কাজ বাইরে থেকে ম্যানুয়ালি করতে হতে পারে।
কক্সবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এর আগে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উখিয়ার ২ ডব্লিউ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন মীর শাহে আলম। সেখানে স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ৪ এক্সটেনশন ক্যাম্পে অবস্থিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
এ সময় কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদ, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার, উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরীসহ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/জোই