পাথর ও ঢিল নিক্ষেপ প্রতিরোধে ট্রেনে বগির বাইরে প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। ঢাকা-কক্সবাজার পথে চলাচলকারী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে এই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ক্যামেরা যুক্ত করা হয়। আগামী ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ দিন পর্যন্ত ক্যামেরার কার্যক্রম মনিটর করা হবে।
নাইটভিশন এই সিসি ক্যামেরা আপাতত একটি বগিতে যুক্ত করা হয়েছে। এ সময় ভিডিও ফুটেজ কেমন আসে, পাথর নিক্ষেপকারীদের দেখা যায় কি না, সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি কতটুকু হচ্ছে— এসব দেখা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য ট্রেনগুলোর বাইরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে বলে রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রেলওয়ে সূত্র জানায়, সারা দেশেই ট্রেনের ভেতরে পাথর-ঢিল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে রক্তাক্তভাবে আহত হচ্ছেন যাত্রীরা। পাথর নিক্ষেপকারীদের কোনোভাবে ঠেকানো যাচ্ছে না।
সম্প্রতি ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। মাসে অন্তত ৫০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে কক্সবাজারের ট্রেনেই। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে কক্সবাজারের রামু রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পাথরে যাত্রীর দাঁত ভেঙে যাওয়া ছাড়াও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। কিন্তু পাথর দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধে রেলওয়ের পক্ষ থেকে গ্যাংকার ট্রেনে চেপে প্রচার চালানো হয়েছে। এদের ধরিয়ে দিতে ঘোষণা করা হয়েছে পুরস্কারের।
কিন্তু কোনোভাবেই থামছে না পাথর নিক্ষেপ। শেষ পর্যন্ত ট্রেনে বগির বাইরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর দেশে চলাচলকারী ট্রেনের মধ্যে প্রথমবারের মতো কক্সবাজারগামী ট্রেনেই যুক্ত হলো সিসি ক্যামেরা। পর্যায়ক্রমে কক্সবাজারগামী ট্রেনে আরও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
দেশে প্রথমবারের মতো ট্রেনের বাইরে সিসি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংকেত এবং টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী তারেক মোহাম্মদ সামছ তুষার। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ট্রেনের অভ্যন্তরে বগির ভেতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এতদিন সিসি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু বগির বাইরের পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে কখনো সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি। প্রথমবারের মতো ঢাকা-কক্সাবাজার রেলপথে চলাচলকারী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এতে পাথর নিক্ষেপ বা ঢিল নিক্ষেপকারীদের চিহ্নিত করা হবে। মোট ১০ দিন আমরা সিসি ক্যামেরার কার্যক্রম মনিটর করব। এরপর ট্রেনের অন্য বগির বাইরে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রেলওয়ের বিভাগীয় ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া সময়ের আলোকে বলেন, ঢাকা-কক্সবাজার পথে চলাচলকারী ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বেড়ে গেছে। এ জন্য আমরা উদ্বিগ্ন। তাই প্রথবারের মতো এই লাইনের ট্রেন পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আমরা ক্যামেরার মাধ্যমে পাথর অপরাধীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করব। নাইটভিশন এসব ক্যামেরার ফুটেজ দেখা হবে। পর্যালোচনা শেষে প্রয়োজনে অন্য বগিতে যুক্ত করা হবে আরও সিসি ক্যামেরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্যজোটের মুখপাত্র এম আর মনজু বলেন, পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে সিসি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে ঢাকা-কক্সবাজার পথে চলাচলকারী ট্রেনে কি পরিমাণ পাথর নিক্ষেপ করা হচ্ছে। দেশে আরও ট্রেন চলে। অনেক ট্রেনেই পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কিন্তু কক্সবাজারগামী ট্রেনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার বিকল্প ছিল না। ওই পথে বলতে গেলে সবচেয়ে বেশি ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
এ ব্যাপারে বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার মোস্তাফফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, দুই পাশে দুটি ক্যামেরা থাকলেও সামনের অংশের ফুটেজ নিতে পারবে। পাশাপাশি সমানভাবে পুরো ট্রেনের সামনের পেছনের অংশের ফুটেজও নিতে পারবে। আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার পরিকল্পনা আছে।
দুই পাশের প্রথমবারের মতো ট্রেনের বাইরে যুক্ত করা ক্যামেরা নিয়ে ট্রেনযাত্রীদের মধ্যেও উৎসাহ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, আগে ট্রেনের বগির ভেতরে ক্যামেরা স্থাপন করেছিল রেলওয়ে। যাত্রীদের নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এবার ট্রেনের বাইরে ক্যামেরা যুক্ত করায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা কমতে পারে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ পেয়ারু বলেন, ট্রেনের বাইরে ক্যামেরা স্থাপন করলে দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করা সহজ হবে। এতদিন রেলওয়ের কারও মাথায় বিষয়টা আসেনি। এখন অনেক দেরিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তারপরও বলব রেলওয়ের এটা ভালো সিদ্ধান্ত। ট্রেনে বগির ভেতরের নিরাপত্তার চেয়ে বাইরের দুর্বৃত্তদের ঠেকানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনের বগিতে যুক্ত সিসি ক্যামেরার ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনের এসি ট্রেনে বগির সঙ্গে একটি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে। একটি বক্সের দুই পাশে দুদিকে দুটি ক্যামেরা দেখা গেছে। দুটি ক্যামেরা ট্রেনের সামনের এবং পেছনের অংশে ভিডিও ফুটেজ নিতে পারবে। জানালা থেকে সরাসরি সামনের দূরত্বে পাথর নিক্ষেপকারীদের ছবি নেওয়ার সুযোগ নেই। ছড়িয়ে পড়া ছবির নিচে নানা মন্তব্য করেছেন নেটিজনরা।
অনেকে মন্তব্য করেছেন এই সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া উচিত ছিল। এতে ধরা পড়ত পাথর নিক্ষেপকারীরা। একজন লেখেন, ‘আমি ২৬ সেপ্টেম্বর এই ট্রেনে করে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম আসছিলাম। কক্সবাজারের রামু স্টেশন পার হওয়ার পর দেখলাম দুজন মানুষ। তারা ট্রেনে পাথর মারছে। আরেকজন মন্তব্য করেছেন এতদিন পর এই বুদ্ধি হলো। যাই হোক শেষ পর্যন্ত করেছে এ জন্য ধন্যবাদ’। আরেকজনের মন্তব্য ‘এটা ভালো উদ্যোগ। তবে কয়দিন পর দেখা যাবে ক্যামেরা খুলে নিয়ে চলে গেছে’।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে