জলের জন্য কাঁদছে নদী

সাইফুল ইসলাম, রংপুর

সারাদেশ

একসময় যে নদী ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন, সেই নদীর বুকেই এখন গড়ে উঠেছে দোকানপাট, স্থাপনা কিংবা চাষের জমি। কোথাও

2026-09-30T04:33:02+00:00
2026-09-30T04:33:02+00:00
 
  বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
জলের জন্য কাঁদছে নদী
সাইফুল ইসলাম, রংপুর
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৩ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
একসময় যে নদী ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন, সেই নদীর বুকেই এখন গড়ে উঠেছে দোকানপাট, স্থাপনা কিংবা চাষের জমি। কোথাও নদী পরিণত হয়েছে সরু খালে, কোথাও ড্রেনে। আবার কোথাও হারিয়ে গেছে নদীর চিহ্নই। দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা, পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় রংপুর বিভাগের বহু নদ-নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সুস্থ নদী অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, বন্যার চাপ মোকাবিলা এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। রংপুর বিভাগের নদ-নদীগুলো এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে অবহেলা আরও দীর্ঘ হলে অনেক নদীর স্বাভাবিক অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। 

সরকারি নথি, নদীর পুরোনো মানচিত্র, স্যাটেলাইট তথ্য এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে প্রতিটি নদীর সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে নদীর জমি দখল, ভরাট ও অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন এবং পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। নদী রক্ষায় শুধু প্রকল্প নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি। বাংলাদেশের নদী ও জলাভূমির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও নদীর প্রবাহের পরিবর্তন ভবিষ্যতে বিভিন্ন অঞ্চলে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে ২০৫০ সালের মধ্যে পুরো বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে— এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি আন্তর্জাতিক জলবায়ু মূল্যায়নের প্রতিষ্ঠিত পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত নয়।

লেখক ও গবেষক মো. আলামীন বলেন, নদী রক্ষায় সরকারকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্তকরণ এবং পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। নদী বাঁচলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিচয় শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেও ধরে রাখতে হবে।

তথ্য বলছে, রংপুর বিভাগের আট জেলায় তিন শতাধিক নদ-নদীর তথ্য বিভিন্ন সরকারি ও স্থানীয় তালিকায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে রংপুর জেলায় ৪৩টি, লালমনিরহাটে ২৫টি এবং কুড়িগ্রামে অর্ধশতাধিক নদ-নদীর উল্লেখ রয়েছে। তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, করতোয়া, আত্রাই ও ইছামতীর পাশাপাশি মানস, টেপা, ধাইজান, বুলাই, আখিরা ও ফুলকুমারসহ অসংখ্য ছোট নদী ও শাখানদী ছড়িয়ে আছে এ অঞ্চলে। কিন্তু তালিকায় নদী থাকলেও বাস্তবে অনেক নদীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোথাও নদীর গতিপথ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও নাব্যতা হারিয়েছে। আবার কোথাও নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ কিংবা চাষাবাদ চলছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও তৈরি হচ্ছে চাপ।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের নদ-নদীর সংখ্যা নির্ধারণ ও তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে বিভাগীয় পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য পুনঃযাচাই করে খসড়া তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে কোন নদী কোথায়, তার সঠিক সীমানা কতটুকু এবং মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তব অবস্থা কী এসব বিষয় নতুন করে সামনে এসেছে।

রংপুর অঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা। এ নদীকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ঘাঘট নদী রংপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পানি নিষ্কাশন ও কৃষিতে ভূমিকা রাখছে। যমুনেশ্বরী বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত। করতোয়া উত্তরবঙ্গের প্রাচীন নদীগুলোর একটি। তবে এসব নদীর বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা কমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থানে নদীর বুক জেগে ওঠে। কোথাও কোথাও সেই জেগে ওঠা ভূমি ধীরে ধীরে স্থায়ী দখলের দিকে চলে যায়।

লালমনিরহাটের সতী নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় প্রশস্ত থাকা নদীটির কোনো কোনো অংশ এখন কয়েক ফুটে সংকুচিত হয়েছে। নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, পুকুর খনন এবং কচুরিপানার আধিক্যের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু সতী নদী নয়, সীমান্তবর্তী খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলি নদীর অস্তিত্ব এবং সরকারি তালিকাভুক্তি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। 


স্থানীয় বাস্তবতা ও সরকারি নথির মধ্যে সমন্বিত যাচাই না হলে এসব নদীর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী উপজেলার গিরাই নদী নিয়েও রয়েছে দখলের অভিযোগ। নদীর জমির কোনো কোনো অংশ ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

নদীর সংকটকে শুধু পানির সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, পানি নিষ্কাশন ও স্থানীয় অর্থনীতি। নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র এবং নদীনির্ভর কৃষি।

শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়া এবং নাব্যতা হ্রাসের কারণে নদীকে ঘিরে থাকা মানুষের জীবন-জীবিকাতেও পরিবর্তন আসছে। একসময় যে নদী নৌপথ, সেচ ও মাছের উৎস ছিল, অনেক জায়গায় সেই নদী এখন বর্ষায় পানি বহনকারী একটি সংকুচিত জলধারায় পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নদী রক্ষার উদ্যোগ শুধু ভাঙন ঠেকানো বা বাঁধ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলমুক্তকরণ, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; নদী একটি অঞ্চলের প্রাণ, কৃষির সহায়ক, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অংশ। রংপুরের নদীগুলো তাই আজ যেন নীরবে জলের জন্য কাঁদছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 

  বিষয়:   জল  নদী  রংপুর  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: