বাংলাদেশের টেলিভিশন জগতের অগ্রপথিক এবং বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম কারিগর চ্যানেল আই। ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর যাত্রা শুরু করা এই চ্যানেলটি আজ তাদের পথচলার ২৭ বছর পার করে পা দিল ২৮ বছরে।
এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা, টেলিভিশন মাধ্যমের রূপান্তর, দেশের সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র এবং গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বরেণ্য কথাসাহিত্যিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর তার অনুভূতি জানিয়েছেন আনন্দ সময়ের সঙ্গে আলাপচারিতায়। তার সেই অনুভূতিগুলোই তুলে ধরা হলো দৈনিক সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য :
শুরুতেই একটা কথা বলি— আমি ছোটবেলা থেকেই যা শিখেছি তা হলো টেলিভিশনকেন্দ্রিক কাজ। আমার আব্বা বা উনার কাছে যারা আসতেন তাদের প্রায় সবাই এই কেন্দ্রিক মানুষ ছিলেন। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার মধ্যেও সেটা ঢুকে গিয়েছিল তখন থেকেই। এরপর নিজের কর্মজীবনে এসে মনে হলো একটা টেলিভিশন চ্যানেল করতে হবে।
তার আগে একটু বলে নিই, এর আগেই আমাদের অন্য ব্যবসা ছিল। কিন্তু আমার যখন এটা মাথায় এলো তখন ব্যবসায়ী অংশীদারদের সঙ্গে আলাপ করলাম। তারাও রাজি হলো। এরপর আমার যেসব সংস্কৃতি জগতের বন্ধুরা ছিল তারাও উৎসাহ দিল। এভাবেই তখন শুরু করার পরিকল্পনা এগিয়ে গেল। যখন আমরা শুরু করেছিলাম, তখন স্যাটেলাইট টেলিভিশনের জগৎটি আমাদের দেশে আজকালের মতো এত বিস্তৃত ছিল না। তবে আমাদের লক্ষ্য ছিল খুব পরিষ্কার— আমরা এমন একটি টেলিভিশন করতে চেয়েছি যা মাটির কাছাকাছি থাকবে, দেশের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির কথা বলবে। সেই লক্ষ্য থেকেই ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর চ্যানেল আই বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল চ্যানেল হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
সেই যে শুরু, তার ধারাবাহিকতায় আমরা আজও পথ চলছি। এখানে বলে রাখা ভালো, টিভি চ্যানেল করার আগে আমি বা আমরা জানতাম এটি বড় একটি বিষয়। কিন্তু কতটা বড় সেটা ঠিক ধারণা করতে পারিনি। পরে দেখলাম এটি গভীরতম মহাসাগরের মতো গভীর বিশাল বিষয়। যাই হোক, আজকে চ্যানেল আই শুধু একটি চ্যানেল নয়, এটি একটি পরিবার। দেশের প্রতিটি প্রান্তে এবং প্রবাসে থাকা বাঙালিরা যখন চ্যানেল আইকে আপন করে নেন, তখন মনে হয় আমাদের সেই ছোট্ট স্বপ্নটি সার্থক হয়েছে।
নব্বই দশকে যখন আমরা আসি, তখন প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু দর্শকদের আন্তরিকতা ছিল আকাশছোঁয়া। আমার মনে আছে, প্রথম দিন অর্থাৎ ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর প্রচারে যাওয়ার পরদিন দেশের সব পত্রিকায় আমাদের এই যাত্রার খবরের পাশাপাশি অনুষ্ঠানের প্রশংসা করে রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। সে সময়ের একটি বিখ্যাত পত্রিকার প্রথম পাতায় চ্যানেল আইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছিল, যা আমাদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেছিল। আর শুরু থেকে দর্শকদের ভালোবাসা সঙ্গে তো ছিলই। সে কারণেই দর্শকদের কথা মাথায় রেখে অনেক কিছুই আমাদের হাত ধরে প্রথম শুরু হয়েছিল।
যেমন ধরুন— দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক, নিয়মিত সিনেমা প্রচার, গানের নানা ধরনের অনুষ্ঠান, বিশিষ্টজনদের নিয়ে বিশেষ ধরনের অনুষ্ঠান, প্রতিদিনের পত্রিকা নিয়ে রাতের বেলা নিয়মিত আলোচনা অনুষ্ঠান ‘আজকের সংবাদপত্র’, দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠান ‘তৃতীয় মাত্রা’ ইত্যাদি। দেশের প্রথম মিউজিক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানও আমাদের করা। ঠিক তেমনিভাবে বাংলা সিনেমা আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বিনোদনমাধ্যম।
যখন সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন আমরা এগিয়ে এসেছি। চলচ্চিত্র উৎসব, মিউজিক অ্যাওয়ার্ড বা মানসম্মত ছবি নির্মাণের পৃষ্ঠপোষকতা— সবকিছুর মূলে ছিল আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা। আর এই যে সবকিছুতে প্রথম হওয়ার একটি বিষয়, এটি কিন্তু কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এগুলো আসলে আমাদের দর্শকদের কতভাবে আমরা বিনোদিত করতে পারি তারই একটি চেষ্টা মাত্র।
আজকে সবকিছু অনেক দ্রুতগতির, হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। ওটিটি, সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম— সব মিলিয়ে মাধ্যম অনেক বেড়েছে। সেজন্য হয়তো প্রথম হওয়ার বিষয়টি সেভাবে আর নেই। তবে পরিবর্তনের হাওয়া যতই লাগুক না কেন, মূল জায়গাটা কিন্তু ঠিক রাখতে হয়। সেটি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা, মানসম্মত কনটেন্ট এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।
প্রযুক্তির বদল ঘটবেই, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার উপায় একটাই— তা হলো সততা ও সৃষ্টিশীলতা। আর সে কারণেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘আইস্ক্রিন’ যাত্রা শুরু করেছে বেশ কিছু বছর হলো। তরুণ প্রজন্মকে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং বিশ্বমানের আধুনিক কনটেন্ট উপহার দেওয়াই আমাদের আগামী দিনের লক্ষ্য।
আমরা প্রতি বছর আমাদের জন্মদিনে নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। সে রকম একটি ব্যাপার এবারও আছে, সেটা হলো আমরা শিল্পীদের একটি ডাইরেক্টরি করতে যাচ্ছি। যেখানে তাদের বর্তমান ঠিকানা, যোগাযোগের মাধ্যম সব থাকবে। এটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে আজ থেকেই শুরু হবে, চলবে বছরব্যাপী। এ ছাড়া আমরা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পী জাহানারা আহমেদকে সম্মাননা দিচ্ছি। আমরা মনে করেছি দেশের পক্ষে, দর্শকদের পক্ষে এটি আমাদের দায়িত্ব তার মতো একজন গুণিজনকে সম্মান জানানো।
চ্যানেল আইয়ের আজকের এই অর্জনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমাদের দর্শক, বিজ্ঞাপনদাতা, কলাকুশলী এবং শুভানুধ্যায়ীদের। তারা শুরু থেকে আমাদের হাত ধরে রেখেছেন। আমরা কথা দিচ্ছি, আগামী দিনগুলোতেও বাঙালির হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা এবং সংস্কৃতির জয়গান গেয়ে যাবে চ্যানেল আই। সবার ভালোবাসা নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই।
আর আমাদের দর্শক, বিজ্ঞাপনদাতা, শিল্পী, কলাকুশলী এবং অগণিত শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশে শুধু এ কথাই বলব— আপনারাই চ্যানেল আইয়ের প্রাণ। আপনারা ১৯৯৯ সালে যেভাবে আমাদের হাত ধরেছিলেন, ঠিক আজও সেভাবেই ভালোবাসার সুতোয় বেঁধে রেখেছেন। আপনাদের এই আস্থার প্রতি সম্মান জানিয়ে চ্যানেল আই আগামী দিনেও সত্যের পক্ষে, সংস্কৃতির পক্ষে এবং মানুষের অধিকার ও আনন্দের পক্ষে অবিচলভাবে কথা বলে যাবে।
অনুলিখন : রোজ হক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে