বাপ্পা মজুমদার— বাংলা গানের পরিসরে যিনি শুধু একজন গায়ক নন; তিনি গীতিকার, সুরকার, সংগীতায়োজক এবং এক স্বতন্ত্র নান্দনিকতার নির্মাতা। তার কণ্ঠে যেমন মিশে থাকে মায়া, তেমনি তার সুরচিন্তায় থাকে সংযম, সৌন্দর্য ও গভীরতার প্রতি একনিষ্ঠ অনুরাগ। ব্যান্ড ‘দলছুট’-এর পথচলা থেকে একক সংগীতের বিস্তৃত ভুবনে পথচলার প্রায় তিন যুগে তার সৃষ্টিশীলতার পরিধি বহুমাত্রিক।
নিজের সেই ভুবন নিয়ে ‘আনন্দ সময়’-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় শিল্পী বাপ্পা মজুমদার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মইনুল হক রোজ।
প্রশ্ন : আপনার সাম্প্রতিক সংগীতচর্চা কেমন চলছে? এই সময়ে কোন ধরনের কাজ আপনাকে বেশি টানছে?
বাপ্পা মজুমদার : সংগীত নিয়ে আমার কাজ কখনোই একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা থাকে না। এই সময়েও গান নিয়ে ভাবছি, কাজ করছি। তবে আমার কাছে কাজের পরিমাণের চেয়ে তার ভেতরের অনুভূতিটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি গান তৈরি করতে গিয়ে আমি চেষ্টা করি, সেটি যেন শুধু একটি সুর বা কথার সমষ্টি না হয়। তার মধ্যে যেন একটি আবহ থাকে, একটি গল্প থাকে, এমন কিছু থাকে, যা শ্রোতাকে নিজের মতো করে অনুভব করার সুযোগ দেয়। আমার মনে হয়, গান শুধু শোনার বিষয় নয়; গান অনুভব করারও বিষয়। আমি যেভাবে জীবনকে দেখি, যেভাবে চারপাশের মানুষ ও সম্পর্কগুলোকে অনুভব করি, সেগুলো কোনো না কোনোভাবে আমার সংগীতে প্রতিফলিত হয়।
প্রশ্ন : নতুন গান তৈরির ক্ষেত্রে আপনার কাছে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— কথা, সুর, নাকি সংগীতায়োজন?
বাপ্পা মজুমদার : আসলে তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে গান তৈরির সময় কোনটি আগে আসবে, সেটি সবসময় নির্দিষ্ট থাকে না। কখনো একটি ভালো কথা আমাকে সুরের দিকে নিয়ে যায়। কখনো সুরের একটি ছোট্ট অংশ থেকে কথার জন্ম হয়। আবার কখনো কোনো নির্দিষ্ট শব্দ, কোনো দৃশ্য কিংবা জীবনের একটি মুহূর্ত গান তৈরির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি গান তৈরি হওয়ার পর সেটি শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়। তারপর তার নিজস্ব জীবন শুরু হয়। কেউ হয়তো গানটি শুনে প্রেমের কথা ভাবেন, কেউ হারানোর কথা, কেউবা নিজের জীবনের কোনো পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে যান। এই বহুমাত্রিক অনুভবের জায়গাটাই আমার কাছে সংগীতের সৌন্দর্য।
প্রশ্ন : বর্তমান সময়ে সংগীত প্রকাশের ধরন অনেক বদলে গেছে। স্ট্রিমিং, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও— এসব নতুন বাস্তবতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
বাপ্পা মজুমদার : প্রযুক্তি সংগীতকে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে একটি গান শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে যে সময় লাগত, এখন অনেক দ্রুত পৌঁছাতে পারে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তবে এর সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। এখন মানুষের হাতে অনেক বেশি গান, অনেক বেশি বিকল্প। ফলে একজন শিল্পীর কাজ শুধু গান তৈরি করা নয়, শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখার জন্যও নতুনভাবে ভাবা।
কিন্তু আমি মনে করি, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া আর নিজের শিল্পীসত্তাকে পরিবর্তন করে ফেলা এক বিষয় নয়। সময়ের ভাষা বুঝতে হবে, শ্রোতার রুচির পরিবর্তনকে উপলব্ধি করতে হবে। কিন্তু নিজের সংগীতের যে জায়গাটা সত্য, সেটিকে ধরে রাখাও জরুরি। আমার কাছে সংগীতের স্থায়িত্ব তার গভীরতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যে গান মানুষের ভেতরে কোনো অনুভূতি জাগাতে পারে, সেটি তার নিজস্ব পথ তৈরি করে নেয়।
প্রশ্ন : নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীরা নানা ধরনের শব্দ, প্রযুক্তি ও সংগীতধারা নিয়ে কাজ করছেন। এই পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখেন?
বাপ্পা মজুমদার : নতুনরা নতুনভাবে ভাববে, এটিই স্বাভাবিক। সংগীত কখনো স্থির কোনো বিষয় নয়। প্রতিটি প্রজন্ম তার সময়, অভিজ্ঞতা এবং চারপাশের পৃথিবী থেকে কিছু না কিছু নিয়ে সংগীত তৈরি করে। আমি নতুনদের কাজ শুনতে পছন্দ করি। তাদের মধ্যে অনেক ধরনের চিন্তা আছে, অনেক নতুন শব্দ আছে, নতুন ধরনের প্রকাশভঙ্গি আছে। এসব সংগীতকে সমৃদ্ধ করে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় একটি বিষয় মনে রাখা দরকার— গান যেন শুধু শব্দের প্রদর্শনী না হয়ে ওঠে। সংগীতে নতুন কিছু করা অবশ্যই দরকার। কিন্তু নতুনত্বের পাশাপাশি নিজের বক্তব্যটাও পরিষ্কার থাকা উচিত।
প্রশ্ন : দলছুটের সংগীতচর্চা আপনার শিল্পীজীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে?
বাপ্পা মজুমদার : দলছুট আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দলছুটের পথচলায় আমরা অনেক কিছু শিখেছি। একসঙ্গে কাজ করা, নতুন শব্দ নিয়ে ভাবা, শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা— সব মিলিয়ে সেই অভিজ্ঞতা আমার সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্যান্ডের সংগীত আর একক সংগীতের মধ্যে পার্থক্য আছে। তবে দুটিরই মূল জায়গা হলো গান। ভালো গান তৈরি করার ইচ্ছা, শ্রোতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংগীতের প্রতি ভালোবাসা— এসবই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন : আগামীর কাজ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী? নতুন কোনো অ্যালবাম, গান বা বিশেষ প্রকল্প নিয়ে ভাবছেন?
বাপ্পা মজুমদার : ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু পরিকল্পনা থাকেই। সংগীত নিয়ে কাজ করতে গেলে সবসময়ই মনে হয়, আরও কিছু করার আছে। নতুন গান, নতুন সুর, নতুন ধরনের সংগীতায়োজন এসব নিয়ে ভাবনা চলতে থাকে। আমি চাই, আগামীর কাজগুলোতে নিজের সংগীতভাষাকে আরও বিস্তৃত করতে। এমন কিছু গান তৈরি করতে, যেগুলোতে আমার পরিচিত আবহ থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে নতুন কিছু অনুভবও থাকবে।
একটি গান তৈরি করার সময় আমি শুধু বর্তমান শ্রোতার কথা ভাবি না। আমি চাই, গানটি কয়েক দিন পরেও শুনলে ভালো লাগুক। কয়েক বছর পরেও যেন তার মধ্যে নতুন কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। তবে নির্দিষ্ট কোনো কাজের কথা বলার আগে সেটি ঠিকভাবে তৈরি হওয়া জরুরি। গান তৈরি হওয়ার পরই তার সঙ্গে শ্রোতার পরিচয় করিয়ে দিতে ভালো লাগে।
প্রশ্ন : জীবনের সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ককে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
বাপ্পা মজুমদার : সংগীত মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমরা আনন্দের সময় গান শুনি, কষ্টের সময় গান শুনি, একা থাকলে গান শুনি, কখনো কোনো কারণ ছাড়াই গান শুনি। সংগীত মানুষের অনুভূতিকে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম। অনেক সময় আমরা নিজের কথাও ঠিকভাবে বলতে পারি না। কিন্তু একটি গান শুনে মনে হয়, এ কথাটাই তো আমি অনুভব করছিলাম— একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?
আমি মনে করি, সংগীত মানুষের ভেতরের একান্ত জায়গাটাকে স্পর্শ করতে পারে। সেই জায়গায় পৌঁছানোর জন্য গানকে সত্য হতে হয়।
প্রশ্ন : দীর্ঘ সংগীতজীবনে আপনার কাছে শিল্পী হিসেবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
বাপ্পা মজুমদার : শিল্পী হিসেবে আমরা অনেক কিছু দেখি, অনেক কিছু শুনি। চারপাশে নানা ধরনের প্রভাব থাকে। কখনো শ্রোতার প্রত্যাশা, কখনো বাজারের চাহিদা, কখনো সময়ের পরিবর্তন— এসবই কাজের ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হয়, আমি যে কাজটি করছি, সেটি কি সত্যিই আমার?
আমি মনে করি, শিল্পীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিজের কাছে সত্য থাকা। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে হবে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিজের যে স্বতন্ত্র জায়গা, সেটিকে ধরে রাখতে হবে। সংগীতের পথ দীর্ঘ, এখানে শেখার শেষ নেই।
প্রশ্ন : শ্রোতাদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
বাপ্পা মজুমদার : শ্রোতাদের ভালোবাসাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি চাই, মানুষ আমার গান শুনে নিজের মতো করে কিছু অনুভব করুক। আমি চাই, গান মানুষের জীবনের অংশ হয়ে থাকুক। শুধু একটি সময়ের জন্য নয়, দীর্ঘ সময় ধরে। শ্রোতাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা সবসময় থাকবে। তাদের ভালোবাসা ও সমর্থন আমাকে আরও কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে