একসময় যে নদী ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন, সেই নদীর বুকেই এখন কোথাও গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও স্থাপনা, কোথাও চলছে চাষাবাদ। কোথাও নদী পরিণত হয়েছে সরু খালে, কোথাও হারিয়েছে স্বাভাবিক প্রবাহ। আবার কোনো কোনো নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া কঠিন। দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা, পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় রংপুর বিভাগের বহু নদনদী এখন অস্তিত্বের সংকটে।
রংপুর বিভাগের আট জেলায় তিন শতাধিক নদ-নদীর তথ্য বিভিন্ন সরকারি ও স্থানীয় তালিকায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে রংপুর জেলায় ৪৩টি, লালমনিরহাটে ২৫টি এবং কুড়িগ্রামে অর্ধশতাধিক নদ-নদীর উল্লেখ রয়েছে। তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, করতোয়া, আত্রাই ও ইছামতীর পাশাপাশি মানস, টেপা, ধাইজান, বুলাই, আখিরা ও ফুলকুমারসহ অসংখ্য ছোট নদী ও শাখানদী ছড়িয়ে আছে এ অঞ্চলে।
তবে সরকারি তালিকায় নদীর নাম থাকলেও মাঠের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। কোথাও নদীর গতিপথ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও নাব্যতা কমেছে। আবার কোথাও নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ কিংবা চাষাবাদ চলছে। এতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও বাড়ছে চাপ।
দেশের নদ-নদীর সংখ্যা নির্ধারণ ও তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগীয় পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য পুনঃযাচাই করে খসড়া তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে কোন নদী কোথায় রয়েছে, তার সীমানা কতটুকু এবং মাঠপর্যায়ে তার বর্তমান অবস্থা কী—এসব বিষয় নতুন করে সামনে এসেছে।
রংপুর অঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা। এ নদীকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ঘাঘট নদী রংপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পানি নিষ্কাশন ও কৃষিতে ভূমিকা রাখছে। যমুনেশ্বরী বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত। করতোয়া উত্তরবঙ্গের প্রাচীন নদীগুলোর একটি।
তবে এসব নদীর বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে অনেক জায়গায় নদীর বুক জেগে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেগে ওঠা এসব জায়গার কোনো কোনো অংশ ধীরে ধীরে স্থায়ী দখলে চলে যাচ্ছে।
লালমনিরহাটের সতী নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় প্রশস্ত থাকা নদীটির কোনো কোনো অংশ এখন কয়েক ফুটে সংকুচিত হয়েছে। নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, পুকুর খনন ও কচুরিপানার আধিক্যের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শুধু সতী নদী নয়, সীমান্তবর্তী খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলি নদীর অস্তিত্ব এবং সরকারি তালিকাভুক্তি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাস্তবতা ও সরকারি নথির সমন্বিত যাচাই না হলে এসব নদীর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী উপজেলার গিরাই নদী নিয়েও রয়েছে দখলের অভিযোগ। নদীর জমির কোনো কোনো অংশ ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নদীর জমি ব্যক্তিমালিকানায় যাওয়ার অভিযোগের সত্যতা থাকলে এর পেছনে নদীর সীমানা নির্ধারণ, ভূমি রেকর্ড ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নদীর সংকটকে শুধু পানির সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, পানি নিষ্কাশন ও স্থানীয় অর্থনীতি।
পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র, নদীনির্ভর কৃষি এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য।
শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও নাব্যতা হ্রাসের কারণে নদী ঘেঁষা মানুষের জীবন-জীবিকাতেও পরিবর্তন আসছে। একসময় যে নদী ছিল নৌপথ, সেচ ও মাছের উৎস, অনেক জায়গায় সেটি এখন বর্ষায় পানি বহনকারী সংকুচিত জলধারায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর পানি উন্নয়ন বিভাগ নদীভাঙন, নদী খনন, বাঁধ মেরামতসহ পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। নদী তীর ভাঙন, খনন ও বাঁধসংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগও রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নদী রক্ষার উদ্যোগ শুধু ভাঙন ঠেকানো কিংবা বাঁধ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলমুক্তকরণ, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
সচেতন সমাজের সদস্য, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক আলামীন বলেন, নদী রক্ষায় সরকারকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্তকরণ এবং পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। নদী বাঁচলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিচয় শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেও ধরে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, নদনদীকে অবহেলা করলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশের পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায় পড়বে। তাই নদী রক্ষায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
নদী ও জলাভূমির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিষয় ভবিষ্যতে বিভিন্ন অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে ‘২০৫০ সালের মধ্যে পুরো বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে’—এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি আন্তর্জাতিক জলবায়ু মূল্যায়নের প্রতিষ্ঠিত পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত নয়। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ নদী অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, বন্যার চাপ মোকাবিলা এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
রংপুর বিভাগের নদনদীগুলো এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দীর্ঘদিনের অবহেলা চলতে থাকলে অনেক নদীর স্বাভাবিক অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সরকারি নথি, পুরোনো মানচিত্র, স্যাটেলাইট তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে প্রতিটি নদীর সীমানা নির্ধারণ জরুরি। একই সঙ্গে নদীর জমি দখল, ভরাট ও অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন এবং পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে।
নদী রক্ষায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি। স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন।
নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়। এটি একটি অঞ্চলের প্রাণ, কৃষির সহায়ক, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অংশ। রংপুর বিভাগের নদীগুলো তাই এখন শুধু পানির জন্য নয়—নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যও যেন নীরবে কাঁদছে।
সময়ের আলো/জোই