এই এক কথা তো, এই আরেক কথা। কখন কোনটা বলছেন- নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। কখনো দলের বিরুদ্ধে, বিরোধীদের পক্ষে। কখনো দলের প্রধানের প্রকাশ্য সমালোচনা, কখনো আবার সরকারের প্রশংসা। এভাবে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বহুবার নিজের অবস্থান বদল করেছেন জামায়াত নেতা মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, যিনি রঞ্জন নামেই বেশ পরিচিত নিজ এলাকা কটিয়াদীতে। একসময় ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি। টিভি টকশোতে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বিষোদগার করে বিরাগভাজন হন সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান রঞ্জন। এরপরই তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। যদিও এমন বহিষ্কার তার ক্যারিয়ারে নতুন নয়।
এবার নতুন করে আলোচনায় এলেন মেজাজি আখতারুজ্জামান রঞ্জন। গত বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে আসা ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব নিয়ে আখতারুজ্জামানের উচ্চবাচ্যের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা দেখা যায়, সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের ইউডি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে উদ্দেশ করে বলছেন, ঘাড় ধরে বের করে দেব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না, তদবির করে পোস্ট নেন। মাইর খাইতে চান?
এ ঘটনায় মামলার পর শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে নেওয়ার সময় আরেক হাস্যকর কাণ্ড ঘটান তিনি। প্রিজন ভ্যান থেকে হেলমেট ছুড়ে ফেলে দেন।
শনিবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর আগে তাকে হাতকড়া ও মাথায় হেলমেট পরাতে যান সিএমএম আদালতের ইনচার্জ এসআই মোরশেদ আলম। জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান তখন বলেন, ‘হাত ধরবেন না, ডোন্ট টাচ মি।’
এরপর তাকে মাথায় হেলমেট ও হাতকড়া পরানো হয়। তবে প্রিজন ভ্যানের গেটে এসে মাথায় থাকা হেলমেট ছুড়ে ফেলে দেন তিনি। বলেন, ‘কেন আমি হেলমেট পরব।’ সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, ‘হেলমেট ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। সরকারের অবৈধ অর্ডার মানি না।’
এ সময় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন আখতারুজ্জামান। এরপর তাকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।
সামাজিকমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে বিএনপির সাবেক এমপি ও নব্য জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামানের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা ও হাস্যরস হচ্ছে। তার অবস্থানকে স্ববিরোধী আ্যাখ্যা দিচ্ছেন অনেক নেটিজেন। তাদের দাবি, আখতারুজ্জামান কখনো এক জায়গায় ঠিক থাকেন না। সব সময় লোভের বশে নিজের চরিত্র ও রাজনৈতিক অবস্থান বদল করেন।
সবশেষ ২০২২ সালে বিএনপি থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর সময়ের আলোকে আখতারুজ্জমান বলেন, ‘ভালো আছি। দলের মধ্যেই আছি। নেতাকর্মীরা আমাকে ছাড়া কই যাবে। এলাকার মানুষের সঙ্গে আছি। সামর্থ্য অনুযায়ী, এলাকার নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।’ এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও সেটি রক্ষা করতে পারেননি আলোচিত এই নেতা।
শেষমেশ নাম লেখান জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে। অথচ ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ সালের বিতর্কিত ডামি ভোটে অংশ নিয়ে জামায়াতের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। নিজেও ওই নির্বাচন করে বেশ বিতর্কিত হন সব মহলে। পরাজিত হন বিশাল ব্যবধানে।
কোন প্রেক্ষাপটে বিএনপি থেকে ৫ বার বহিষ্কার
বিএনপি থেকে পাঁচবার বহিষ্কার হন কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান। পরে ফের ক্ষমা চেয়ে দলেও ফিরেন কয়েকবার। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য হন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পুলিশের সাবেক আইজি নৌকার প্রার্থী নূর মোহাম্মদের কাছে হেরে যান আখতারুজ্জামান। একসময় তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপিরও সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আখতারুজ্জামান পঞ্চমবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কার হন ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। তবে নানা সময় সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে টকশো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলে তিনি আলোচনায় ছিলেন। এমন অবস্থার মধ্যেই জামায়াতে যোগ দেন আখতারুজ্জামান।
যোগ দিয়েই বলেছেন, জামায়াত ‘দেশপ্রেমিক’ একটি দল। একসময় জামায়াতের কড়া সমালোচক এই মুক্তিযোদ্ধা প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করে জামায়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। জামায়াতে যোগ দেওয়ার কারণও জানিয়েছেন তিনি।
আখতারুজ্জামান বলেন, বিএনপির কথার ঠিক নেই। যিনি (তারেক রহমান) বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধে লাখ মানুষকে হত্যা করেছে’। কথাটা সঠিক নয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে, জামায়াতের বিরুদ্ধে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। আপনি একের পর এক মিথ্যা বলে যাবেন; এর প্রতিবাদে আমি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছি। কারণ জামায়াত তো দেশদ্রোহী কোনো দল নয়; জামায়াতে ইসলামী একটি দেশপ্রেমিক দল। জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করে এবং তাদের যে গঠনতন্ত্র আছে, সেখানেও এটা স্পষ্টভাবে লেখা আছে।
আখতারুজ্জামান দলের ‘নেতা’ কি না অবস্থান স্পষ্ট করল জামায়াত
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা নন, তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য বলে দাবি করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আখতারুজ্জামান জামায়াতের নেতা নন। তিনি সহযোগী সদস্য বা প্রাথমিক সদস্য হয়েছেন।
জামায়াতে সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিক সদস্য হওয়ার পর কর্মী, এরপর সদস্য এবং পরে নেতা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে হিসেবে আখতারুজ্জামান ‘সিম্পল’ সদস্য মাত্র। আখতারুজ্জামানকে জামায়াতের নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে